|| বাংলার নবাবের ওয়েবসাইটে স্বাগতম ||
আমি রুষে উঠে যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া | ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া।
বিজ্ঞান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বিজ্ঞান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

সাইবার যুদ্ধে বাংলাদেশের আধিপত্য স্মরণ করিয়ে দেয় ৭১-কে


নেক যুদ্ধ দেখেছে বিশ্ববাসী। দেখেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ অনেক যুদ্ধের ভয়াবহতাও। কিন্তু উপর্যুপরি আক্রমনে প্রতিপক্ষকে এমন গুড়িয়ে দিতে হয়তো দেখেনি কোনদিন; দেখেনি কিভাবে তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়তে পারে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হয়ে ওঠা একটা দেশের সাইবার জগত। ওয়েবসাইট হ্যাকের ঘটনাও পৃথিবীতে বিরল নয়; বিরল নয় সাইবার স্পেস দখলের ঘটনাও। কিন্তু, এমন করে একটি দেশের সাইবার স্পেস দখলে নিয়ে নেওয়ার ঘটনা কেবল বিস্ময়করই নয়, অভাবনীয়ও বটে। আর এই বিস্ময়কর, অভাবনীয় ঘটনাটি ঘটিয়ে দেখিয়েছে বিবিএইচএইচ এর নেতৃত্বে বাংলাদেশের হ্যাকার গোষ্ঠি। সাথে রয়েছে বিসিএ, ইসিএ (এক্সপায়ার সাইবার আর্মি), 3xp1r3 সাইবার আর্মি সহ আরও অন্যান্য হ্যাকার গ্রুপ। নৈতিক কারণেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ের হ্যাকার গ্রুপেরও সমর্থন পেয়েছে বাংলাদেশী হ্যাকাররা। 

ঠিক কী কারণে শুরু হলো এই সাইবার যুদ্ধ তা' আর নতুন করে বলার দরকার নেই। তারপরেও যারা জানেন না তারা ঘুরে আসতে পারেন এই লিংক থেকে

শনিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

স্টিফেন হকিং -এর স্রষ্টা সম্পর্কিত অযৌক্তিক মতবাদ


আসসালামুয়ালাইকুম। ভুল হলে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন। আমি বিজ্ঞান সম্পর্কে তেমন কিছু জানিনা। না জানা সত্তেউ আমি বিজ্ঞান সম্পর্কে কিছু কথা আপনাদের কাছে তুলে ধরব। আমার কথার মুল বিষয় হল, কিছু দিন আগে বিক্ষ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এর একটি মতবাদ সম্পর্কে।

এবার আসল কথাই আসি।

কিছু দিন আগে বিক্ষ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং একটা মতবাদ দিয়েছিলেন স্রষ্টা সম্পর্কে। মতবাদে তিনি যুক্তি দিয়ে প্রমান করেন যে সব কিছু শূন্য থেকে সৃষ্টি। তার মতবাদ অনুযায়ী যদি মহাবিশ্বের সকল শক্তির সমষ্টি শূন্য হয় তবে এসকল কিছু তৈরি হতে কোন স্রষ্টার দরকার নেই।

সকল শক্তির যোগফল শূন্য বলতে আমরা কি বুঝি ??? হকিং বলেন বিগব্যাং এর সময় এতবড় বিস্ফোরনের জন্য প্রচুর শক্তির দরকার ছিল। এই শক্তি কথা থেকে এল???

রবিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০১১

ভয়ংকর মাছ পিরানহা—এক সামুদ্রিক দানব


Through The Brazillian Wilderness বইয়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট থিওডর রুজভেল্ট পিরানহা সম্পর্কে লিখেছেন--- “বিশ্বের সবচেয়ে হিংস্র মাছ হচ্ছে পিরানহা। সবচেয়ে ভয়ংকর মাছ- হাঙ্গর বা বারাকুডাস- সাধারানত তাদের চেয়ে আকৃতিতে ছোট প্রাণি আক্রমন করে, কিন্তু পিরানহার দল অভ্যাসগতভাবেই তাদের চেয়ে আকৃতিতে বড় প্রাণি আক্রমন করে। অসতর্কভাবে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হাতের আঙ্গুল তারা মুহুর্তেই ছিনিয়ে নিতে পারে; তারা সাতারুদের কেটে ছিড়ে খেয়ে ফেলে। প্যারাগুয়ের প্রায় প্রতিটি নদীমাতৃক শহরে এমন লোক রয়েছে যাদেরকে এই পিরানহারা ছিড়ে নিয়েছে অল্প পরিমানে হলেও। কোন দূর্বল বা আঘাতপ্রাপ্ত মানুষ বা প্রাণিকে তারা একেবারে ছিড়ে খেয়ে ফেলবে মুহুর্তেই; কারণ পানির মধ্যে রক্তের উপস্থিতি তাদেরকে প্রায় পাগল করে দেয়। তারা আঘাতপ্রাপ্ত কোন পক্ষী বা প্রাণিকে একেবারে টুকরো টুকরো করে ফেলবে, অথবা মাছের কোন বড় লেজকে ছিড়ে ফেলবে; কিন্তু পিরানহারা হচ্ছে ছোট্ট শরীরওয়ালা ক্ষুদ্র মাছ যাদের রয়েছে বড় বড় দাঁতওয়ালা চোয়াল যা দিয়ে তারা খুব সহজেই যেকোন কিছু তাদের মুখের মধ্যে নিয়ে নিতে পারে। তাদের ব্লেডের মত ধারালো দাঁতগুলো হাঙ্গরের দাঁতের মত তীক্ষ্ণ আর তাদের চোয়ালের মাংশে রয়েছে অপরিসীম শক্তি। উম্মত্ত, ক্রোধান্বিত হলে এই মাছগুলো তাদের দাঁতগুলো পরম গতিতে মাংশ ও হাড়ের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিতে পারে। ছোট্ট জালিসম্বলিত মাথা, তীক্ষ্ণ ভয়ংকর রক্ত চোখ আর নিষ্ঠুর শক্তিশালী চোয়াল নিয়ে এই মাছগুলো যেন দানবীয় শক্তির প্রতিরুপ। তীক্ষ্ণ ভয়ংকর চোখের মতই ধূর্ত এর গতি। এমন শক্তিশালী, হিংস্র, ক্রোধান্বিত প্রদর্শণী আমি পিরানহা ছাড়া আর কারো মাঝে দেখিনি।

মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই কিভাবে পিরানহারা একটি মানব শরীর বা গরু ছিড়ে খেয়ে ফেলতে পারে তা নিয়ে অসংখ্য মিথ বা গল্প প্রচলিত রয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রচলিত মিথ হচ্ছে, রক্তের ঘ্রাণ তাদেরকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে আর তারা প্রচন্ডভাবে মাংশাসী মাছ। ‘পিরানহা ক্যাটল’ নামে সর্বাধিক প্রচলিত ব্রাজিলিয়ান মিথটি বলছে, পিরানহারা খুব ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে গিয়ে পানিতে নামা প্রথম গরুটাকে আক্রমন করে দলের অন্যান্য পিরানহাদের ছুটে আসতে আহবান জানায়। যদিও পরবর্তীতে Biology Letters নামক বইতে দুইজন বিজ্ঞানী- হেলডার কোয়েরজ ও আনা মাগুরয়ান—এই তথ্য ভুল প্রমান করেন। এতদসত্বেও সারিনামে পরিচালিত একটি গবেষনায় দেখা যায় যে, পিরানাহা মানুষও আক্রমন করতে পারে, বিশেষ করে পানির লেভেল যখন অনেক নীচে নেমে যায়। হিংস্র লুন্ঠনকারী হিসেবে এদের খ্যাতি রয়েছে। ঝাকে ঝাকে এরা শিকারের পিছনে ছোটে আর দলবদ্ধভাবে আক্রমন করে বলেই এদের থেকেও বিশালকায় শিকার এদের হাত থেকে রক্ষা পায়না।

ধারালো দাঁত আর মাংশের প্রতি তীব্র আকর্ষনের জন্য এই মাছ সমধিক পরিচিত। দক্ষিন আমেরিকাতে এদের সবচেয়ে বেশি দেখতে পাওয়া যায়। ভেনিজুয়েলাতেও প্রচুর পরিমানে পাওয়া যায় এই মাছ। সেখানে অবশ্য স্থানীয়ভাবে এদেরকে caribes নামে ডাকা হয়। বাংলাদেশের কাপ্তাই লেকেও কিছু পিরানহার সন্ধান পাওয়া যায়। ঠিক কত সংখ্যক প্রজাতির পিরানহা রয়েছে তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়না। তবে ধারণা করা হয় যে এদের প্রজাতির সংখ্যা হচ্ছে ৩০ থেকে ৬০।

গড়ে ১৪ থেকে ২৬ সেমি লম্বা হয় একটি পিরানহা। তবে সর্বোচ্চ ৪৩ সেমি লম্বা পিরানহাও দেখা গিয়েছে বলে বলা হয়। সব ধরণের পিরানহারই উভয় চোয়ালে এক সারি করে ধারালো দাঁত রয়েছে। দাঁতগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজান। প্রতিটা দাঁতই ত্রিমাত্রিক কিন্তু নিম্নের পাশটি ব্লেডের চেয়েও তীক্ষ্ণ আর ধারালো।

মানুষের অর্থনৈতিক জীবনেও ভুমিকা রয়েছে পিরানহার। বিভিন্ন ছোট্ট ছোট্ট যন্ত্রপাতি আর অস্ত্র তৈরিতে ব্যাবহৃত হয় এদের দাঁত। একুরিয়াম মাছ হিসেবে পিরানহার ব্যাবহার রয়েছে। খাদ্য হিসেবে বেশ জনপ্রিয় এই পিরানহা। ট্যুরিষ্টদের সুভেনির হিসেবেও শুকনো পিরানহাদের ব্যাবহার দেখা যায়।

নানা বৈচিত্র সম্বলিত এই পিরানহাদের উপর দৃষ্টি পড়েছে হলিউড পরিচালকদেরও। James Bond সিরিজের You Only Live Twice ফিল্মে হাড়-সংযুক্ত মাংশ খেতে দেখা যায় এই পিরানহাকে। পরবর্তীতে পানির মধ্য থেকে শুধু এক টুকরো হাড়ই উত্তোলন করা হয়।১৯৭৮ সালে ‘পিরানহা’ নামে পিরানহাদের হিংস্রতা দেখিয়ে তৈরি করা একটি হলিউডি চলচ্চিত্র। ১৯৮১ ও ২০১০ সালে নির্মান করা হয় যথাক্রমে পিরানহার সিকুয়েল ও রি-মেক।

বুধবার, ৪ আগস্ট, ২০১০

পাইলেও পাইতে পারো অমুল্য রতন!

অলসতার চরম সীমা অতিক্রম করেছি। আজ ঘুম থেকে উঠেছি সকাল দশটায়। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। সকালে দেরী করে ঘুম থেকে উঠলে দিনটা ভালো যায় না। জেনেও কেন যেন দেরী করে ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছা করে। অলসতার এর উপরে আর কোন সীমা আছে বলে
আমার জানা নেই।

ভাবছি আবার একটু ব্যাস্ত হয়ে পড়বো। কিন্তু কী নিয়ে ব্যস্ত হবো? গান শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু এত অলস হয়েছি যে প্লে লিস্ট সিলেক্ট করতে মন চায় না। বাংলায় একটা বাগধারা আছে, গোঁফ-খেজুরে। সেদিন এই বাগধারার অর্থটা পড়েছিলাম- গোঁফে খেজুর পড়ে থাকলেও খায়না যে। আমার অলসতা তাকেও হার মানায়। কম্পুখানায় নতুন কোন গানের কালেকশানও নেই। এখানেও অলসতা। নতুন গানগুলো যে ডাউনলোড করবো বা কারো কাছ থেকে নিয়ে আসবো অলসতার কারণে তাও করা হয়ে ওঠেনা।

সবথেকে হাস্যকর বিষয় হলো যে ঈদানীং অলসতার কারণে ভাত খেতেও মন চায় না। এটার একটা ভালো দিকও আছে বলে মনে হয়। আমার যা তবিয়ৎ, তাতে না খেয়ে থাকলে যদি কিছুটা উপকার হয়। মাঝে মাঝে ভাবি, ঈশ! আল্লাহ তায়ালা যদি অলসদের জন্য একটা নতুন ভুবন তৈরি করে দিত যেখানে শুধু অলসরা বসবাস করবে, তাহলে কতই না ভালো হতো!

সকল অলস মিলে একটা জগতে বসবাস। কেউ সেখানে কাজ করবেনা। সারাদিন শুধু খাবে আর ঘুমাবে। অলসতা আর অলসতা। বাহ! কি দারুণ। কিন্তু এই দারুণটা আর কতদিন থাকতো। খাবারের ব্যবস্থা করতেও তো কাজ করা প্রয়োজন। কি জানি, মাথার সব চিন্তা আওলাইয়া যাচ্ছে। তবে শেষ করার আগে একখান ভালো কথা কয়ে যাই। আজ জেনেছি, নির্দিষ্ট সীমা থেকে কম বা বেশী তরঙ্গ দৈর্ঘ হলে সেই আলোক মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়না। কিন্তু সেই আলোকরশ্মি গোচরীভুত আলোকের থেকে বেশি শক্তিশালী। যেমনঃ গামা রশ্মি, আলফা রশ্মি ইত্যাদি। শব্দের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। শ্রাব্যতা-সীমার বাইরে আল্ট্রাসোনিক বা সুপারসনিক সাউন্ড আমরা শুনতে পাই না। কিন্তু এই শব্দতরঙ্গকে কাজে লাগিয়ে চলাফেরার কাজ চালিয়ে নেয় বাদুড়।

অতএব, একথা বলা যায় যে, যা আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয় তার ক্ষমতা যা আমাদের ইন্দ্যিয়গ্রাহ্য তার ক্ষমতা থেকে অনেক বেশি। এক কথায়, যার ক্ষমতা যত বেশি তা তত বেশি মানুষের ইন্দ্রিয়গাহ্যতার বাইরে। অতএব, যেই মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের সহ এই পুরো বিশ্ববহ্মান্ডকে নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি তো সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সুতরাং, তাকে আমরা দেখতে পাবোনা সেটাই তো স্বাভাবিক।

বাহ! চমৎকার তো। আমরা যে আল্লাহ তায়ালাকে দেখতে পাইনা, তা বিজ্ঞানসম্মত। বিজ্ঞান না জেনে আমরা আবালের মত কত প্রশ্ন করে থাকি!

শুক্রবার, ২১ মে, ২০১০

বিশ্বসৃষ্টিতে কোরাণের পাঁচটি বিষয়

আজকের বেশিরভাগ তরুণ বিজ্ঞানীর চিন্তাধারা খ্যাতিমান অথচ চিন্তার দিক থেকে চরম মনোভাবাপন্ন বিজ্ঞানীর চিন্তাধারার আদলেই পরিগঠিত হয়ে চলেছে। নোবেল প্রাইজপ্রাপ্ত জনৈক চিকিৎসাবিজ্ঞানী বছর কয়েক আগে সর্বসাধারণের বুঝবার উপযোগী একখানা বই লিখে এখন পর্যন্ত এই মর্মে প্রচার করে বেড়াচ্ছেন যে, বিভিন্ন মৌলিক উপাদান যেকোন সুযোগে হঠাৎ করে জীবন্ত কিছুর সৃষ্টি ঘটাতে পারে। তাঁর মতে, এভাবে পরিবেশগত বাহ্যিক প্রভাবে বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন জীবন্ত প্রাণির উদ্ভব ঘটেছে। আর এভাবে জটিল প্রক্রিয়ার পরিণতিতে সৃষ্টি হয়েছে মানুষ।
অথচ অন্যদিকের বিচারে প্রাণ তথা জীবনের উদ্ভাবনার ক্ষেত্রে আধুনিক বিজ্ঞানের এই ‘হঠাৎ আশ্চর্য তত্ত্ব’ সম্পূর্ণ বিপরীত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেও মানুষকে নিঃসন্দেহে সহায়তা করতে পারে।
মানুষে জন্ম ও জীবন ধারার ব্যাপারে যেসব প্রক্রিয়া বিদ্যমান, সেই সম্পর্কে যতই গবেষনা হচ্ছে, দেখা যাচ্ছে—তা ক্রমশই জটিল থেকে জটিলতর হয়ে ধরা পড়ছে। আর কেউ যখন এ বিষয়ে খুটিনাটি অনেক বেশি জেনে নিত পারছেন, তার পক্ষে আরো বেশি অবাক হওয়া ছাড়া উপায় থাকছেনা। বস্তুত জীবনের যে সাংগঠনিক প্রক্রিয়া, সে সম্পর্কে যত বেশি জ্ঞান আহরণ করা যায়, প্রাণের উদ্ভাবনার ক্ষেত্রে উপরোক্ত ‘হঠাৎ আশ্চর্য তত্ত্বের’ সম্ভাবনা ততই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে পড়ে। এভাবে জীবন সংক্রান্ত জ্ঞান--গবেষনার পথে আরো বেশি অগ্রসর হলে, বিশেষত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু-পরমাণুর ক্ষেত্রে পৌছালে পর দেখা যায়, সকল যুক্তিই একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের প্রতিই অঙ্গুলী নির্দেশ করে। কিন্তু সুকঠিন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও অনেকেই তাদের ধ্যান-ধারণা কে তুচ্ছ বা নগন্য ভাবতে পারছেননা। বরং বিনয়ের পরিবর্তে তাদের মধ্যে মাথাচাড়া দিচ্ছে ঔদ্ধত্য ও অহংবোধ। এই অবস্থায় মানুষ যেমন তার আকন্দ ও ভোগের পথে চলতে গিয়ে সকল রকম প্রতিবন্ধকতা অস্বীকার করতে চায়; ঠিক তেমনিভাবেই অনেকে আজ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব। এটাই বস্তুত আধুনিক বস্তুবাদী-সমাজের মানসিক প্রতিচ্ছবি এবং আজকের পশ্চাত্য জগতে (এবং শিক্ষিত সমাজে) বস্তুবাদী এই ভাবধারা বিস্তার লাভ করেছে অধিক মাত্রায়।

কোরাণে বিশ্বসৃষ্টি-সংক্রান্ত পাঁচটি প্রধান প্রধান বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য বিদ্যমান। এবারে বিজ্ঞানের আলোকে এক এক করে সেইসব তথ্যের বিচার-পর্যালোচনা করা হবে।
১. কোরাণের মতে, আকাশসমুহ ও পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে ছয়টি সময়কালে। শুধু তাই নয়, কোরাণের বর্ণনামতে, উপরোক্ত ছয়টি সমকালের মধ্যেই মহাকাশের বস্তুনিশ্চয়ও সৃষ্টি হয়েছিলো; এবং উক্ত সময়কালের মধ্যেই পৃথিবীর যাবতীয় উন্নয়ন কর্ম এমনভাবে সম্পাদিত হয়েছিলো—যদ্দরুন এই গ্রহটি (জীবনধারণের যাবতীয় উপকরণসহ) মনুষ্য বসবাসের উপযোগী হতে পেরেছে। কোরাণের বর্ণনা মতে, পৃথিবীর এইসব উন্নয়নমুলক কর্মকান্ড সম্পাদিত হয়েছিলো চারটি সময়কালের মধ্যে। কোরাণের এই চারটি সময়কালের বর্ণনা থেকে যে-কারো মনে আধুনিক বিজ্ঞানের দ্বারা প্রমানিত মানুষের আবির্ভাবের চারটি ভূতাত্ত্বিক পর্যায়ের কথা উদয় হওয়ে স্বাভাবিক। আমরা সবাই জানি, পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের কালে কিভাবে চারটি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়েছিলো। বলা অনাবশ্যক যে, পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব-সংক্রান্ত এই চারটি পর্যায় বা সময়কাল হচ্ছে বিজ্ঞানের একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা বা Hypothesis। তবে, বাস্তবে সেই চারটি পর্যায়ে যে কি ঘটেছিলো, সে বিষয়ে বিজ্ঞানের নিকট সঠিক কোন তথ্য নেই।
এই প্রসঙ্গে আরো বলে নেওয়া দরকার যে, কোরাণের ৪১ নং সুরার ৯ থেকে ১২ নং আয়াতের বর্ণনানুসারে মহাকাশের বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্র ও পৃথিবী পরিগঠিত হয়েছিলো দুইটি সময়কালে বা পর্যায়ে। এক্ষেত্রে আমরা সূর্য এবং তার উপসৃষ্টি, বিশেষতঃ পৃথিবীর সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করতে পারি। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানের পরিবেশিত তথ্য হল, গ্রহ-নক্ষত্র ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্ম সম্পাদিত হয়েছিলো দু’টি পর্যায়ে। এক, আদি নিহারিকার ঘনিভুত হওয়ার ঘটনায়; এবং দুই, সেই নিহারিকার বিভক্ত বা টুকরা হওয়ার ঘটনায়। বিজ্ঞানের এই তথ্য সুতরাং কোরাণের বর্ণনার সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে। কোরাণে পরিস্কারভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, সৃষ্টির এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো – মহাকাশের ধুম্রমন্ডলীর দ্রবণ এবং পরবর্তী পর্যায়ে তার বিভক্তির মধ্য দিয়ে। অতএব, এক্ষেত্রে আমরা কোরাণের বর্ণনা ও বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তথ্যের মধ্যে পুরোপুরি মিল অর্থাৎ সঙ্গতি দেখতে পাচ্ছি।
২. বিজ্ঞান জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও তার গ্রহ সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার দুটি পর্যায়ে ছিলো পরস্পর সংলগ্ন। এদিকে এই দুই সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার ঘটনা ওতোপ্রতোভাবে জড়িত থাকার বিষয়টাও কোরাণের আয়ারতের দ্বারা প্রমানিত ও সাব্যস্ত হচ্ছে এবং আমরা তা ইতিমধ্যে পর্যালোচনাও করেছি।
৩. কোরাণে বলা হয়েছে, মহাবিশ্বের সৃষ্টির আদি-পর্যায়ে ছিলো ‘ধুম্রকুন্ডলী’। অর্থাৎ সৃষ্ট বস্তুসমুহ এই পর্যায়ে ছিল প্রধানত গ্যাসীয় অবস্থায়। বিজ্ঞানও বলছে, সৃষ্টির আদি ছিলো নিহারিকা বা ‘নেবুলা’—যা মুলত গ্যাসীয় ধুম্রকুন্ডলীর অনুরুপ। সুতরাং এক্ষেত্রেও কোরাণের বক্তব্য বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তথ্যের সাথে পুরোপুরিভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই সাব্যস্ত হচ্ছে।
৪. কোরাণে ৭ সংখ্যার উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, আকাশের সংখ্যা একাধিক বা অনেক। এই সাত সংখ্যার অর্থ ও তাৎপর্য আমরা ইতিপুর্বে আলোচনা করেছি। আধুনিক বিজ্ঞানও জানাচ্ছে যে, মহাশুন্য-পদার্থবিজ্ঞানের পর্যক্ষকবৃন্দ গ্যালাকটিক সিস্টেম বা ছায়াপথ-পদ্ধতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে লক্ষ কোটি গ্রহ-নক্ষত্র সম্বলিত আসমান তথা মহাশুন্যের অস্তিত্ব প্রমান করেছেন। তারা এও দেখেছে ছায়াপথের সংখ্যা বহু। সুতরাং এক্ষেত্রে কোরাণের বক্তব্য আধুনিক বিজ্ঞানের দ্বারা সত্য বলে প্রমানিত হচ্ছে। পক্ষান্তরে, আমাদের পৃথিবীর মত একাধিক গ্রহের অস্তিত্বের কথা কোরাণের বিভিন্ন আয়াতে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞান এই সম্পর্কে এখনো তেমন কোন প্রমান দিতে পারছেনা। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা এই যে, বহু ‘পৃথিবীর’ অস্তিত্ব খুবই সম্ভব।
৫. কোরাণে ‘আকাশসমুহ’ তথা ছায়াপথ ও ‘পৃথিবী’র মাঝখানে অর্থাৎ এতদুভয়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ে সৃষ্ট-বস্তুর অস্তিত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে। মহাকাশের জ্যোতির্বিজ্ঞান-পদ্ধতির সুসংগঠিত ধারার বাইরে সেতু বা সংযোজনকারী হিসাবে অবস্থিত বস্তু বা পদার্থনিচয়কে আমরা অনায়াসেই আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর মাঝখানে অবস্থিত সেই সৃষ্ট-বস্তু হিসেবে শনাক্ত করতে পারি।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, যদিও কোরাণে বর্ণিত বিশ্বসৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায়-সংক্রান্ত বক্তব্যের সবটা আধুনিক বিজ্ঞান নিজস্ব তথ্য ও পরিসংখ্যান দ্বারা প্রমানিত ও সাব্যস্ত করতে পারছেনা; কিন্তু বিশ্বসৃষ্টি-সংক্রান্ত বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত তথ্যের কোন বিরোধী বানী কিংবা বক্তব্য আমরা এ যাবৎ কোরাণে পাচ্ছিনা। কোরাণের এসব বাণী ও বক্তব্য, সুতরাং, ওহী প্রাপ্ত বাণী হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার অধিকারী। কেননা আমরা দেখেছি, বিশ্বসৃষ্টি সম্পর্কে বাইবেলের পুরাতন নিয়মে যেসন বক্তব্য বিদ্যমান, বিজ্ঞানের তথ্য-প্রমানের আলোকে তা এটাও গ্রহণযোগ্য নয়। অবশ্য এতে বিস্মিত হওয়ার তেমন কিছু নাই। কেননা বাইবেলের যে সেকেরডোটাল পাঠ থেকে আমরা বিশ্বসৃষ্টি সম্বন্ধে যেসব বক্তব্য পাচ্ছি সেসব রচিত হয়েছিল ইহুদিদের ব্যবিলন থেকে উৎখাতের প্রাক্কালে—পুরোহিতদের দ্বারা। এই পুরোহিতরা সে সময়ে এমনভাবে বাইবেলের এসব বাণী রচনা করেছিলেন, যেসব বাণীতে তাদের নিজেদের মনমত ধর্মতাত্বিক অভিমতই শুধু প্রতিফলিত হতে পেরেছিলো। তাছাড়া বিশ্বসৃষ্টি সম্পর্কে বাইবেলের বক্তব্যের সাথে কোরাণের বক্তব্যের এই যে দুস্তর ব্যাবধান-- তা আরও একটি কারণে সবিশেষ গুরুত্বলাভের অধিকারী। তাহলো, ইসলামের শুরু থেকেই মোহাম্মদের (দঃ) বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উত্থাপন করে আসা হচ্ছে যে, তিনি বাইবেলের বর্ণনা হুবহু নকল করে কোরান রচনা করেছিলেন। কিন্তু কোরাণের বাণী ও বাইবেলের বক্তব্যের মধ্যে উপরে বর্ণিত ব্যাবধানই প্রমান করছে যে, এই অভিযোগ একান্ত অমুলক। বিশেষত বিশ্বসৃষ্টির ব্যাপারে বাইবেল ও কোরাণের বানীর এই আলোচনার দ্বারা এটাই প্রমানিত হয় যে, মোহাম্মদের (দঃ) বিরুদ্ধে উত্থাপিত উপরোক্ত অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন। আর যদি এই অভিযোগ সত্য বলে ধরে নেওয়া হয় – তাহলে সে অবস্থায় এখানে যে প্রশ্নটি না জেগে পারেনা, তা হলোঃ চৌদ্দশত বছর আগে আবির্ভুত হয়ে কি করে একজন মানুষের পক্ষে বাইবেলের বাণীর ভুল-ত্রুটি যথাযথভাবে সংশোধন করা সম্ভব? কিভাবে তার পক্ষে সম্পূর্ণ নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি মোতাবেক বাইবেল থেকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ত্রুটিপূর্ণ বাণীসমুহ বাদ দিয়ে এমন সব বাণী ও বক্তব্য রচনা করে কোরাণে সন্নিবেশিত করা সম্ভব—যা এতদিন—এতকাল পরে কেবলমাত্র আজকের বিজ্ঞানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষনার সত্য বলে প্রমানিত হতে পারছে? সুতরাং ‘কোরাণ মোহাম্মদের (দঃ) নিজস্ব রচনা’ কিংবা তিনি ‘বাইবেলের বাণী থেকে নকল করে কোরাণের বাণী তৈরি করেছিলেন’ বলে যে ধারণা পোষন করা হয় – সে ধারণা আদৌ সত্য ও সমর্থনযোগ্য নয়। কেননা, বিশ্বসৃষ্টি-সম্পর্কিত কোরাণের বানী ও বর্ণনা – বাইবেলের বাণী ও বক্তব্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

আধুনিক জোতির্বিজ্ঞান ও মহাগ্রন্থ আল-কোরাণ

গ্রহের সংখাঃ
প্রাচীনকালে পৃথিবী ছাড়াও আরও পাঁচটি গ্রহের অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষ অবহিত ছিলো। যেমনঃ বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি এবং শনি গ্রহ। আধুনিক কালে এসে আরও তিনটি গ্রহের অস্তিত্ব আবিস্কৃত হয়েছেঃ ইউরেনাস, নেপচুন ও প্লুটো।

ধরে নেওয়া হয় যে, কোরানে ‘কাওকাব’ শব্দের দ্বারা গ্রহাদির কথা বলা হয়েছে— তবে গ্রহাদির কোন সংখ্যার উল্লেখ করা হয় নাই। হযরত ইউসুফ (আঃ) স্বপ্নে এগারোটি গ্রহ দেখেছিলেন—তবে সেখানে যেভাবে এসব গ্রহের কথা উল্লেখিত হয়েছে, তা নিছক ধারণা বা কল্পনা বলে প্রতীয়মান হয়। কোরাণের একটি সুবিখ্যাত আয়াতে ‘কাওকাব’ শব্দের অর্থ ও সংগা সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
“আল্লাহ আসমান সমুহ ও জমিনের আলো। তাঁহার আলোর উপমা যেন একটা তাক বা কুলঙ্গী, -- যাহার মধ্যে রহিয়াছে একটা আলোকময় বস্তু। এই আলোকময় বস্তুটি রহিয়াছে একটা কাঁচের পাত্রে। আর সেই কাঁচ পাত্রটি যেন একটি গ্রহ, -- যাহা মতির মত ঝকমক করিতেছে”। -- সুরা- ২৪, আয়াত- ৩৫।

গত জুলাই ১৬, ১৯৮৭ ইত্তেফাকের তৃতীয় পৃষ্ঠায় ‘সূর্যের দশম গ্রহ’ শীর্শক এক খবরে জানা গেছে, “মার্কিন বিজ্ঞানীরা ‘সূর্যের দশম গ্রহের’ সন্ধান পাইয়াছেন। সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিতে ইহার কমপক্ষে ৭০০ শত বছর লাগে এবং পৃথিবীর আকৃতি হইতে ইহা পাঁচ গুন বড়”। নাসা-- বিজ্ঞানী জন এন্ডার্সনের সাক্ষাৎকার। সংবাদসূত্র-ইউসিস।
১৯৮৯ সালে সূর্যের আরেকটি গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৯৮৭ সালে আবিষ্কৃত গ্রহটির নামকরণ করা হয়ছে ‘ভলকান’ এবং সর্বশেষ ১৯৮৯ সালে আবিষ্কৃত গ্রহটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘এক্স’। এই নিয়ে সৌরমন্ডলে গ্রহের সংখ্যা দাড়ালো মোট ১১ টি। এবং এভাবে কোরাণের ১১ টি গ্রহের সংবাদ সত্য বলে প্রমানিত হলো।

মহাশূন্যে চন্দ্র ও সূর্যের নিজস্ব গতিবেগঃ
যে আরবী শব্দটির দ্বারা সূর্য ও চন্দ্রের এই নিজস্ব-সঞ্চালিত গতিবেগের কথা বোঝানো হয়েছে—সেটি হচ্ছে একটি ক্রিয়াপদ--- ‘সাবাহা’। পৃথিবীকে কেন্দ্র করে তার চারপাশে আবর্তন সমাপ্ত করার পাশাপাশি চন্দ্র নিজস্ব অক্ষরেখার উপরেও পূর্ণভাবে একবার আবর্তিত হয়ে থাকে। এই উভয় ধরণের আবর্তণের ক্ষেত্রে তার সময় লাগে সাড়ে ২৯ দিন। আর যেহেতু চন্দ্রের এই উভয় ধরণের আবর্তন যুগপৎভাবে সংগঠিত হয়ে থাকে, সেহেতু আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদের শুধুমাত্র একটা দিকই দেখতে পাই।

আপন মেরুদন্ডের উপরে ঘুরপাক খেতে সূর্যের সময় লাগে মোটামুটিভাবে ২৫ দিন। অবশ্য সূর্যের অক্ষরেখা ও মেরুর এই আবর্তনের মধ্যে কিছুটা বিশেষ পার্থক্য বিদ্যমান। তবে মোটের উপরে সূর্যও নিজস্ব গতি-আবর্তনের চক্রে বাঁধা।
এদিকে আধুনিক বিজ্ঞানের সুপ্রতিষ্ঠিত তথ্যের দ্বারাও মহাশুন্যে সূর্য ও চন্দ্রের এই গতি-আবর্তন হচ্ছে সমর্থিত। সত্যি, সপ্তম শতাব্দিতে আবির্ভুত হয়ে কোন মানুষ- সে মানুষ যত বড় বিদ্বানই হোন না কেন- সূর্য ও চন্দ্রের গতি-আবর্তনের এই সঠিক তথ্য যে তিনি শুধুমাত্র নিজ জ্ঞানবুদ্ধির সাহায্যে কল্পনা করে নিতে সক্ষম হয়েছেন, সেকথা কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারেনা।

দিনরাত্রির ধারাঃ
এমন এক সময় ছিলো যখন সবাই ধরেই নিয়েছিলেন যে, এই পৃথিবীটাই হচ্ছে বিশ্বের মুল কেন্দ্র এবং পৃথিবীকে কেন্দ্র করেই সূর্য হচ্ছে আবর্তিত। সুতরাং, সূর্যের সেই পৃথিবী-কেন্দ্রিক পরিক্রমনের ফলেই দিনরাত্রির পালাবদল ঘটছে। সেকালে এই ধারণাটা ছিলো একান্ত স্বাভাবিক। সুতরাং সেকালে বসে দিনরাত্রির সেই পালাবদলের কথা বলতে গিয়ে কারো পক্ষেই কি পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্যের সেই ঘূর্ণন-আবর্তনের কথা এড়িয়ে যাওয়া আদৌ সম্ভব ছিলো ? অথচ কোরাণের কোন সময়ই বলা হচ্ছে না যে, পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্যের আবর্তনের ফলেই দিনরাত্রির পালাবদল ঘটছে। নিচে আমরা এতদসংক্রান্ত কোরাণের বিভিন্ন আয়াত তুলে ধরছি—

“তোমরা কি লক্ষ্য কর না আল্লাহ কিভাবে রাত্রিকে দিনের মধ্যে মিলাইয়া দেন এবং দিনকে মিলাইয়া দেন রাত্রির মধ্যে?” – সুরা- ৩১, আয়াত- ২০।

“তিনি কুন্ডলীর মত জড়াইয়া দেন রাত্রিকে দিনের উপর এবং তিনি দিনকেও কুন্ডলীর মত জড়াইয়া দেন রাত্রির উপর”। -- সুরা- ৩৯, আয়াত- ০৫।

সেই ‘কাওয়াবা’ শব্দের সর্বোত্তম অনুবাদ হচ্ছে, ‘To coil or to window অর্থাৎ কুন্ডলী পাকানো, কুন্ডলী পাকিয়ে জড়ানো’।

দিনরাত্রির পরিক্রমনের বেলায় বাস্তবে মহাশুন্যে কি ঘটে থাকে? সেই ঘটনা যে আসলে কি, একান্ত হালে মার্কিন-নভোচারীবৃন্দ মহাশুন্যযান থেকে নিজেরা তা প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তার চিত্রও তারা তুলে রেখেছেন। এসময় তারা ছিলেন পৃথিবী থেকে অনেক-অনেক দূরে— চাঁদের বক্ষে। যেখান থেকে তারা লক্ষ্য করেছেন, পৃথিবীর যে অর্ধেক অংশ সূর্যের দিকে ফিরানো, সূর্য কি রকম স্থায়ীভাবে পৃথিবীর সেই পৃষ্টভাগ আলোকজ্জল করে রাখছে, কিভাবে ভূমন্ডলের উপর আবর্তিত হচ্ছে। অন্যদিকে সূর্যরশ্মি তুলনামুলকভাবে একই অবস্থান থেকে তার উপরে আলো বিতরণ করছে। এর ফলে, ২৪ ঘন্টায় পৃথিবী যখন আপন মেরুদন্ডের উপর আবর্তিত হচ্ছে -- তখনও ভূমন্ডলের যে অর্ধেক স্থানজুড়ে বিরাজ করছে আলো অর্থাৎ দিন এবং বাকী যে অর্ধেক এলাকা অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকছে অর্থাৎ রাত্রি – দিনরাত্রির সেই উভয় এলাকা একই সময়ে সেই একই আবর্তনে ঘুরপাক খাচ্ছে। ‘দিনরাত্রির এই যে অবিরত আবর্তন’, —সেই বিষয়টাই কোরাণে উপরোক্ত ‘কাওয়াবা’ শব্দের দ্বারা এরকম সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।

এভাবে শুধুমাত্র আধুনিক যুগে এসেই মানুষ কোরাণে বর্ণিত ‘দিনরাত্রির অবিরত আবর্তনের’ ধারণাটা সহজে বুঝে নিতে পারছে। কেননা, এখন আমরা সূর্যের স্থিরভাবে আলো বিতরণ ও পৃথিবীর অবিরত ঘুর্ণন সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জানতে পারছি। গোলাকার ভূমন্ডলে কুন্ডলী পাকানো অবস্থায় দিনরাত্রির এই যে অবিরত আবর্তন এবং একটির অভ্যন্তরে আরেকটির অনুপ্রবেশ—সেই বিষয়টাই কোরাণে এমন ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে যেন পৃথিবী যে গোলাকার – সেই ধারণাটা কোরাণ অবতীর্ণ হওয়ার কালেও সত্যি হিসাবে স্বীকৃত ছিলো। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা মোটেও তা নয়। অর্থাৎ পৃথিবী যে গোলাকার সেরকম কোন ধারণা তখন চালু ছিলোনা।

মহাশুন্যের বিবর্তনের ধারাঃ
সুর্য এমনই একটি নক্ষত্র যার বয়স মোটামুটিভাবে সাড়ে চারশত কোটি বৎসরঃ এটাই মহাশুন্য–পদার্থবিজ্ঞান বিশষজ্ঞদের সর্বশেষ রায়। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে সূর্য তার বিবর্তনের কোন্‌ পর্যায়ে রয়েছে এবং সেই সাথে অপরাপর নক্ষত্রেরও বিবর্তণ ধারার পর্যায় সমুহ কি কি- আধুনিক বিজ্ঞান আজ সে সম্পর্কে অনেক কিছুই নির্দিষ্ট করে বলতে সক্ষম। সূর্যের অভ্যন্তরে হাইড্রোজেন এটম যেভাবে হিলিয়াম এটমে রুপান্তরিত হচ্ছে—তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট বিচার করেই আধুনিক বিজ্ঞান এই মর্মে রায় দিচ্ছে যে, সূর্য এখনো তার বিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। স্মর্তব্য যে, আধুনিক বিজ্ঞানের হিসাব মোতাবেক সূর্যসহ অপারপর নক্ষত্রের বিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়ের মেয়াদ হলো দশশত কোটি বছর। সুতরাং, থিয়রী অনুযায়ী সূর্যের বিবর্তনের এই প্রাথমিক পর্যায় আগামী আরও সাড়ে পাঁচশত কোটি বৎসর ধরে অব্যাহত থাকবে। আমরা আগেই দেখেছি, অনেক নক্ষত্র ইতিমধ্যেই বিবর্তনের এই প্রাথমিক পর্যায় অতিক্রম করে দ্বিতীয় পর্যায়ে পৌছে গেছে। কেননা, ঐসব নক্ষত্রের অভ্যন্তরস্থ হাইড্রোজেন রুপান্তরিত হয়ে হিলিয়ামে পরিণত হওয়ার ব্যাপারটা পূর্ণ পরিণতি লাভ করেছে। ফলে, রুপান্তরের প্রক্রিয়ার ঘটেছে পরিসমাপ্তি। পরণতিতে, ঐসব নক্ষত্রের উপরিস্তরের প্রবৃদ্ধিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিবর্তনের এই একই ধারায় সূর্যের উত্তাপ হ্রাস পাচ্ছে বলেও নীরিক্ষায় ধরা পড়েছে। সূরা (৮১) তকবিরের ১ নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ “সেইদিন সূর্যের আলো নিস্প্রভ হইয়া পড়িবে”।

আধুনিক বিজ্ঞান তথ্য-পরিসংখ্যান তুলে ধরে এই মর্মে ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করেছে যে, বর্তমানে সৌরমন্ডলীয়-পদ্ধতিতে যে অবস্থাটা বিরাজ করছে, আগামী কয়েকশত কোটি বছর পর সেই অবস্থা আর থাকবেনা। অন্যকথায়, চুড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত নক্ষত্রসমুহের প্রতিটি পর্যায়ের অবস্থা প্রমান-দলিল সহ বিচার বিশ্লেষন করে এই মর্মে ভবিষ্যদ্বাণী করা যেতে পারে যে, একইভাবে সূর্যের অন্তিম দশাও একদিন ঘনিয়ে আসবে।

কোরাণের ৩৬ নং সূরার ৩৮ নং আয়াতে চন্দ্র ও সূর্যের পথ পরিক্রমায় তাদের উভয়ের জন্য গন্তব্যস্থল হিসেবে নির্ধারিতি একটি স্থানের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়ঃ

“সূর্য তার নির্ধারিত স্থলের উদ্দেশ্যে পথ-পরিক্রমায় নিরত। ইহা মহাপরাক্রমশালী সুবিজ্ঞ সত্তারই নির্ধারিত ব্যাবস্থা।”
উপরে উদ্ধৃত কোরাণের আয়াতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, সূর্য তার একটা নিজস্ব নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলের দিকে দ্রুত ধাবমান।"

বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, সূর্যের এই নিজস্ব গন্তব্যস্থলটি যে কোথায়, আধুনিক জোতির্বিজ্ঞান তা নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেঃ এমনকি জোতির্বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে সূর্যের সেই নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলের নামকরণ পর্যন্ত করে ফেলেছেন। নামটা হলোঃ সোলার এপেক্স। বস্তুত গোটা সৌরমন্ডল মহাশুন্যে অবস্থিত ‘Constellation of Hercules’ নামক একটি কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে চলেছে। আর সেই কেন্দ্রটির অবস্থান মহাশুন্যের ঠিক কোন্‌ স্থানে- আধুনিক জোতির্বিজ্ঞান তাও সঠিকভাবে নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছে এবং বিজ্ঞান-বিশ্বে তা প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই নির্দিষ্ট কেন্দ্রের দিকে সৌরমন্ডলের এগিয়ে চলার গতিও আধুনিক জোতির্বিজ্ঞান নির্ধারণ করে ফেলেছে; -- আর সেই গতিটা হচ্ছে মোটামুটিভাবে প্রতি সেকেন্ডে ১২ মাইল।

কোরাণের মাত্র দু’টি আয়াতের যে বক্তব্য, সে সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়েই আমাদের মহাশুন্য-সংক্রান্ত আধুনিক বিজ্ঞানের এত সব তথ্য-পরিসংখ্যান তুলে ধরতে হলো। দেখা যাচ্ছে যে, এক্ষেত্রে কোরাণের বক্তব্য এবং আধুনিক বিজ্ঞানের দলিল-প্রমান ও তথ্য-পরিসংখ্যানের রায় এক এবং অভিন্ন।

উপসংহারে, এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, এভাবে জোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত জ্ঞান-গবেষনার পথে আরো বেশি অগ্রসর হলে, বিশেষত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু-পরমাণুর ক্ষেত্রে পৌছালে পর দেখা যায়, সকল যুক্তিই একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের প্রতিই অঙ্গুলী নির্দেশ করে।


Dr. Maurice Bucaille ‘র The Bible, The Qur’an and Science’ অবলম্বনে
এতদসংক্রান্ত পূর্বের লেখাটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

মঙ্গলবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১০

আধুনিক জোতির্বিজ্ঞান ও মহাগ্রন্থ আল-কোরাণ

আধুনিক জোতির্বিজ্ঞান ও মহাগ্রন্থ আল-কোরাণ

গ্রহের সংখাঃ
প্রাচীনকালে পৃথিবী ছাড়াও আরও পাঁচটি গ্রহের অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষ অবহিত ছিলো। যেমনঃ বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি এবং শনি গ্রহ। আধুনিক কালে এসে আরও তিনটি গ্রহের অস্তিত্ব আবিস্কৃত হয়েছেঃ ইউরেনাস, নেপচুন ও প্লুটো।

ধরে নেওয়া হয় যে, কোরানে ‘কাওকাব’ শব্দের দ্বারা গ্রহাদির কথা বলা হয়েছে— তবে গ্রহাদির কোন সংখ্যার উল্লেখ করা হয় নাই। হযরত ইউসুফ (আঃ) স্বপ্নে এগারোটি গ্রহ দেখেছিলেন—তবে সেখানে যেভাবে এসব গ্রহের কথা উল্লেখিত হয়েছে, তা নিছক ধারণা বা কল্পনা বলে প্রতীয়মান হয়। কোরাণের একটি সুবিখ্যাত আয়াতে ‘কাওকাব’ শব্দের অর্থ ও সংগা সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

“আল্লাহ আসমান সমুহ ও জমিনের আলো। তাঁহার আলোর উপমা যেন একটা তাক বা কুলঙ্গী, -- যাহার মধ্যে রহিয়াছে একটা আলোকময় বস্তু। এই আলোকময় বস্তুটি রহিয়াছে একটা কাঁচের পাত্রে। আর সেই কাঁচ পাত্রটি যেন একটি গ্রহ, -- যাহা মতির মত ঝকমক করিতেছে”। -- সুরা- ২৪, আয়াত- ৩৫।

গত জুলাই ১৬, ১৯৮৭ ইত্তেফাকের তৃতীয় পৃষ্ঠায় ‘সূর্যের দশম গ্রহ’ শীর্শক এক খবরে জানা গেছে, “মার্কিন বিজ্ঞানীরা ‘সূর্যের দশম গ্রহের’ সন্ধান পাইয়াছেন। সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিতে ইহার কমপক্ষে ৭০০ শত বছর লাগে এবং পৃথিবীর আকৃতি হইতে ইহা পাঁচ গুন বড়”। নাসা-- বিজ্ঞানী জন এন্ডার্সনের সাক্ষাৎকার। সংবাদসূত্র-ইউসিস।
১৯৮৯ সালে সূর্যের আরেকটি গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৯৮৭ সালে আবিষ্কৃত গ্রহটির নামকরণ করা হয়ছে ‘ভলকান’ এবং সর্বশেষ ১৯৮৯ সালে আবিষ্কৃত গ্রহটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘এক্স’। এই নিয়ে সৌরমন্ডলে গ্রহের সংখ্যা দাড়ালো মোট ১১ টি। এবং এভাবে কোরাণের ১১ টি গ্রহের সংবাদ সত্য বলে প্রমানিত হলো।

মহাশূন্যে চন্দ্র ও সূর্যের নিজস্ব গতিবেগঃ

যে আরবী শব্দটির দ্বারা সূর্য ও চন্দ্রের এই নিজস্ব-সঞ্চালিত গতিবেগের কথা বোঝানো হয়েছে—সেটি হচ্ছে একটি ক্রিয়াপদ--- ‘সাবাহা’। পৃথিবীকে কেন্দ্র করে তার চারপাশে আবর্তন সমাপ্ত করার পাশাপাশি চন্দ্র নিজস্ব অক্ষরেখার উপরেও পূর্ণভাবে একবার আবর্তিত হয়ে থাকে। এই উভয় ধরণের আবর্তণের ক্ষেত্রে তার সময় লাগে সাড়ে ২৯ দিন। আর যেহেতু চন্দ্রের এই উভয় ধরণের আবর্তন যুগপৎভাবে সংগঠিত হয়ে থাকে, সেহেতু আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদের শুধুমাত্র একটা দিকই দেখতে পাই।

আপন মেরুদন্ডের উপরে ঘুরপাক খেতে সূর্যের সময় লাগে মোটামুটিভাবে ২৫ দিন। অবশ্য সূর্যের অক্ষরেখা ও মেরুর এই আবর্তনের মধ্যে কিছুটা বিশেষ পার্থক্য বিদ্যমান। তবে মোটের উপরে সূর্যও নিজস্ব গতি-আবর্তনের চক্রে বাঁধা।
এদিকে আধুনিক বিজ্ঞানের সুপ্রতিষ্ঠিত তথ্যের দ্বারাও মহাশুন্যে সূর্য ও চন্দ্রের এই গতি-আবর্তন হচ্ছে সমর্থিত। সত্যি, সপ্তম শতাব্দিতে আবির্ভুত হয়ে কোন মানুষ- সে মানুষ যত বড় বিদ্বানই হোন না কেন- সূর্য ও চন্দ্রের গতি-আবর্তনের এই সঠিক তথ্য যে তিনি শুধুমাত্র নিজ জ্ঞানবুদ্ধির সাহায্যে কল্পনা করে নিতে সক্ষম হয়েছেন, সেকথা কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারেনা।

দিনরাত্রির ধারাঃ
এমন এক সময় ছিলো যখন সবাই ধরেই নিয়েছিলেন যে, এই পৃথিবীটাই হচ্ছে বিশ্বের মুল কেন্দ্র এবং পৃথিবীকে কেন্দ্র করেই সূর্য হচ্ছে আবর্তিত। সুতরাং, সূর্যের সেই পৃথিবী-কেন্দ্রিক পরিক্রমনের ফলেই দিনরাত্রির পালাবদল ঘটছে। সেকালে এই ধারণাটা ছিলো একান্ত স্বাভাবিক। সুতরাং সেকালে বসে দিনরাত্রির সেই পালাবদলের কথা বলতে গিয়ে কারো পক্ষেই কি পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্যের সেই ঘূর্ণন-আবর্তনের কথা এড়িয়ে যাওয়া আদৌ সম্ভব ছিলো ? অথচ কোরাণের কোন সময়ই বলা হচ্ছে না যে, পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্যের আবর্তনের ফলেই দিনরাত্রির পালাবদল ঘটছে। নিচে আমরা এতদসংক্রান্ত কোরাণের বিভিন্ন আয়াত তুলে ধরছি—

“তোমরা কি লক্ষ্য কর না আল্লাহ কিভাবে রাত্রিকে দিনের মধ্যে মিলাইয়া দেন এবং দিনকে মিলাইয়া দেন রাত্রির মধ্যে?” – সুরা- ৩১, আয়াত- ২০।

“তিনি কুন্ডলীর মত জড়াইয়া দেন রাত্রিকে দিনের উপর এবং তিনি দিনকেও কুন্ডলীর মত জড়াইয়া দেন রাত্রির উপর”। -- সুরা- ৩৯, আয়াত- ০৫।

সেই ‘কাওয়াবা’ শব্দের সর্বোত্তম অনুবাদ হচ্ছে, ‘To coil or to window অর্থাৎ কুন্ডলী পাকানো, কুন্ডলী পাকিয়ে জড়ানো’।

দিনরাত্রির পরিক্রমনের বেলায় বাস্তবে মহাশুন্যে কি ঘটে থাকে? সেই ঘটনা যে আসলে কি, একান্ত হালে মার্কিন-নভোচারীবৃন্দ মহাশুন্যযান থেকে নিজেরা তা প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তার চিত্রও তারা তুলে রেখেছেন। এসময় তারা ছিলেন পৃথিবী থেকে অনেক-অনেক দূরে— চাঁদের বক্ষে। যেখান থেকে তারা লক্ষ্য করেছেন, পৃথিবীর যে অর্ধেক অংশ সূর্যের দিকে ফিরানো, সূর্য কি রকম স্থায়ীভাবে পৃথিবীর সেই পৃষ্টভাগ আলোকজ্জল করে রাখছে, কিভাবে ভূমন্ডলের উপর আবর্তিত হচ্ছে। অন্যদিকে সূর্যরশ্মি তুলনামুলকভাবে একই অবস্থান থেকে তার উপরে আলো বিতরণ করছে। এর ফলে, ২৪ ঘন্টায় পৃথিবী যখন আপন মেরুদন্ডের উপর আবর্তিত হচ্ছে -- তখনও ভূমন্ডলের যে অর্ধেক স্থানজুড়ে বিরাজ করছে আলো অর্থাৎ দিন এবং বাকী যে অর্ধেক এলাকা অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকছে অর্থাৎ রাত্রি – দিনরাত্রির সেই উভয় এলাকা একই সময়ে সেই একই আবর্তনে ঘুরপাক খাচ্ছে। ‘দিনরাত্রির এই যে অবিরত আবর্তন’, —সেই বিষয়টাই কোরাণে উপরোক্ত ‘কাওয়াবা’ শব্দের দ্বারা এরকম সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।

এভাবে শুধুমাত্র আধুনিক যুগে এসেই মানুষ কোরাণে বর্ণিত ‘দিনরাত্রির অবিরত আবর্তনের’ ধারণাটা সহজে বুঝে নিতে পারছে। কেননা, এখন আমরা সূর্যের স্থিরভাবে আলো বিতরণ ও পৃথিবীর অবিরত ঘুর্ণন সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জানতে পারছি। গোলাকার ভূমন্ডলে কুন্ডলী পাকানো অবস্থায় দিনরাত্রির এই যে অবিরত আবর্তন এবং একটির অভ্যন্তরে আরেকটির অনুপ্রবেশ—সেই বিষয়টাই কোরাণে এমন ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে যেন পৃথিবী যে গোলাকার – সেই ধারণাটা কোরাণ অবতীর্ণ হওয়ার কালেও সত্যি হিসাবে স্বীকৃত ছিলো। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা মোটেও তা নয়। অর্থাৎ পৃথিবী যে গোলাকার সেরকম কোন ধারণা তখন চালু ছিলোনা।

মহাশুন্যের বিবর্তনের ধারাঃ

সুর্য এমনই একটি নক্ষত্র যার বয়স মোটামুটিভাবে সাড়ে চারশত কোটি বৎসরঃ এটাই মহাশুন্য–পদার্থবিজ্ঞান বিশষজ্ঞদের সর্বশেষ রায়। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে সূর্য তার বিবর্তনের কোন্‌ পর্যায়ে রয়েছে এবং সেই সাথে অপরাপর নক্ষত্রেরও বিবর্তণ ধারার পর্যায় সমুহ কি কি- আধুনিক বিজ্ঞান আজ সে সম্পর্কে অনেক কিছুই নির্দিষ্ট করে বলতে সক্ষম। সূর্যের অভ্যন্তরে হাইড্রোজেন এটম যেভাবে হিলিয়াম এটমে রুপান্তরিত হচ্ছে—তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট বিচার করেই আধুনিক বিজ্ঞান এই মর্মে রায় দিচ্ছে যে, সূর্য এখনো তার বিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। স্মর্তব্য যে, আধুনিক বিজ্ঞানের হিসাব মোতাবেক সূর্যসহ অপারপর নক্ষত্রের বিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়ের মেয়াদ হলো দশশত কোটি বছর। সুতরাং, থিয়রী অনুযায়ী সূর্যের বিবর্তনের এই প্রাথমিক পর্যায় আগামী আরও সাড়ে পাঁচশত কোটি বৎসর ধরে অব্যাহত থাকবে। আমরা আগেই দেখেছি, অনেক নক্ষত্র ইতিমধ্যেই বিবর্তনের এই প্রাথমিক পর্যায় অতিক্রম করে দ্বিতীয় পর্যায়ে পৌছে গেছে। কেননা, ঐসব নক্ষত্রের অভ্যন্তরস্থ হাইড্রোজেন রুপান্তরিত হয়ে হিলিয়ামে পরিণত হওয়ার ব্যাপারটা পূর্ণ পরিণতি লাভ করেছে। ফলে, রুপান্তরের প্রক্রিয়ার ঘটেছে পরিসমাপ্তি। পরণতিতে, ঐসব নক্ষত্রের উপরিস্তরের প্রবৃদ্ধিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিবর্তনের এই একই ধারায় সূর্যের উত্তাপ হ্রাস পাচ্ছে বলেও নীরিক্ষায় ধরা পড়েছে। সূরা (৮১) তকবিরের ১ নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ “সেইদিন সূর্যের আলো নিস্প্রভ হইয়া পড়িবে”।

আধুনিক বিজ্ঞান তথ্য-পরিসংখ্যান তুলে ধরে এই মর্মে ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করেছে যে, বর্তমানে সৌরমন্ডলীয়-পদ্ধতিতে যে অবস্থাটা বিরাজ করছে, আগামী কয়েকশত কোটি বছর পর সেই অবস্থা আর থাকবেনা। অন্যকথায়, চুড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত নক্ষত্রসমুহের প্রতিটি পর্যায়ের অবস্থা প্রমান-দলিল সহ বিচার বিশ্লেষন করে এই মর্মে ভবিষ্যদ্বাণী করা যেতে পারে যে, একইভাবে সূর্যের অন্তিম দশাও একদিন ঘনিয়ে আসবে।

কোরাণের ৩৬ নং সূরার ৩৮ নং আয়াতে চন্দ্র ও সূর্যের পথ পরিক্রমায় তাদের উভয়ের জন্য গন্তব্যস্থল হিসেবে নির্ধারিতি একটি স্থানের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়ঃ

“সূর্য তার নির্ধারিত স্থলের উদ্দেশ্যে পথ-পরিক্রমায় নিরত। ইহা মহাপরাক্রমশালী সুবিজ্ঞ সত্তারই নির্ধারিত ব্যাবস্থা।”
উপরে উদ্ধৃত কোরাণের আয়াতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, সূর্য তার একটা নিজস্ব নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলের দিকে দ্রুত ধাবমান।"

বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, সূর্যের এই নিজস্ব গন্তব্যস্থলটি যে কোথায়, আধুনিক জোতির্বিজ্ঞান তা নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেঃ এমনকি জোতির্বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে সূর্যের সেই নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলের নামকরণ পর্যন্ত করে ফেলেছেন। নামটা হলোঃ সোলার এপেক্স। বস্তুত গোটা সৌরমন্ডল মহাশুন্যে অবস্থিত ‘Constellation of Hercules’ নামক একটি কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে চলেছে। আর সেই কেন্দ্রটির অবস্থান মহাশুন্যের ঠিক কোন্‌ স্থানে- আধুনিক জোতির্বিজ্ঞান তাও সঠিকভাবে নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছে এবং বিজ্ঞান-বিশ্বে তা প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই নির্দিষ্ট কেন্দ্রের দিকে সৌরমন্ডলের এগিয়ে চলার গতিও আধুনিক জোতির্বিজ্ঞান নির্ধারণ করে ফেলেছে; -- আর সেই গতিটা হচ্ছে মোটামুটিভাবে প্রতি সেকেন্ডে ১২ মাইল।

কোরাণের মাত্র দু’টি আয়াতের যে বক্তব্য, সে সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়েই আমাদের মহাশুন্য-সংক্রান্ত আধুনিক বিজ্ঞানের এত সব তথ্য-পরিসংখ্যান তুলে ধরতে হলো। দেখা যাচ্ছে যে, এক্ষেত্রে কোরাণের বক্তব্য এবং আধুনিক বিজ্ঞানের দলিল-প্রমান ও তথ্য-পরিসংখ্যানের রায় এক এবং অভিন্ন।

উপসংহারে, এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, এভাবে জোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত জ্ঞান-গবেষনার পথে আরো বেশি অগ্রসর হলে, বিশেষত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু-পরমাণুর ক্ষেত্রে পৌছালে পর দেখা যায়, সকল যুক্তিই একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের প্রতিই অঙ্গুলী নির্দেশ করে।


Dr. Maurice Bucaille ‘র The Bible, The Qur’an and Science’ অবলম্বনে
এতদসংক্রান্ত পূর্বের লেখাটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

বৃহস্পতিবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১০

বিশ্বসৃষ্টিতে কোরাণের পাঁচটি বিষয়।

বিশ্বসৃষ্টিতে কোরাণের পাঁচটি বিষয়।

আজকের বেশিরভাগ তরুণ বিজ্ঞানীর চিন্তাধারা খ্যাতিমান অথচ চিন্তার দিক থেকে চরম মনোভাবাপন্ন বিজ্ঞানীর চিন্তাধারার আদলেই পরিগঠিত হয়ে চলেছে। নোবেল প্রাইজপ্রাপ্ত জনৈক চিকিৎসাবিজ্ঞানী বছর কয়েক আগে সর্বসাধারণের বুঝবার উপযোগী একখানা বই লিখে এখন পর্যন্ত এই মর্মে প্রচার করে বেড়াচ্ছেন যে, বিভিন্ন মৌলিক উপাদান যেকোন সুযোগে হঠাৎ করে জীবন্ত কিছুর সৃষ্টি ঘটাতে পারে। তাঁর মতে, এভাবে পরিবেশগত বাহ্যিক প্রভাবে বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন জীবন্ত প্রাণির উদ্ভব ঘটেছে। আর এভাবে জটিল প্রক্রিয়ার পরিণতিতে সৃষ্টি হয়েছে মানুষ।
অথচ অন্যদিকের বিচারে প্রাণ তথা জীবনের উদ্ভাবনার ক্ষেত্রে আধুনিক বিজ্ঞানের এই ‘হঠাৎ আশ্চর্য তত্ত্ব’ সম্পূর্ণ বিপরীত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেও মানুষকে নিঃসন্দেহে সহায়তা করতে পারে। মানুষে জন্ম ও জীবন ধারার ব্যাপারে যেসব প্রক্রিয়া বিদ্যমান, সেই সম্পর্কে যতই গবেষনা হচ্ছে, দেখা যাচ্ছে—তা ক্রমশই জটিল থেকে জটিলতর হয়ে ধরা পড়ছে। আর কেউ যখন এ বিষয়ে খুটিনাটি অনেক বেশি জেনে নিত পারছেন, তার পক্ষে আরো বেশি অবাক হওয়া ছাড়া উপায় থাকছেনা। বস্তুত জীবনের যে সাংগঠনিক প্রক্রিয়া, সে সম্পর্কে যত বেশি জ্ঞান আহরণ করা যায়, প্রাণের উদ্ভাবনার ক্ষেত্রে উপরোক্ত ‘হঠাৎ আশ্চর্য তত্ত্বের’ সম্ভাবনা ততই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে পড়ে। এভাবে জীবন সংক্রান্ত জ্ঞান--গবেষনার পথে আরো বেশি অগ্রসর হলে, বিশেষত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু-পরমাণুর ক্ষেত্রে পৌছালে পর দেখা যায়, সকল যুক্তিই একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের প্রতিই অঙ্গুলী নির্দেশ করে। কিন্তু সুকঠিন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও অনেকেই তাদের ধ্যান-ধারণা কে তুচ্ছ বা নগন্য ভাবতে পারছেননা। বরং বিনয়ের পরিবর্তে তাদের মধ্যে মাথাচাড়া দিচ্ছে ঔদ্ধত্য ও অহংবোধ। এই অবস্থায় মানুষ যেমন তার আকন্দ ও ভোগের পথে চলতে গিয়ে সকল রকম প্রতিবন্ধকতা অস্বীকার করতে চায়; ঠিক তেমনিভাবেই অনেকে আজ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব। এটাই বস্তুত আধুনিক বস্তুবাদী-সমাজের মানসিক প্রতিচ্ছবি এবং আজকের পশ্চাত্য জগতে (এবং শিক্ষিত সমাজে) বস্তুবাদী এই ভাবধারা বিস্তার লাভ করেছে অধিক মাত্রায়।

কোরাণে বিশ্বসৃষ্টি-সংক্রান্ত পাঁচটি প্রধান প্রধান বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য বিদ্যমান। এবারে বিজ্ঞানের আলোকে এক এক করে সেইসব তথ্যের বিচার-পর্যালোচনা করা হবে।
১. কোরাণের মতে, আকাশসমুহ ও পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে ছয়টি সময়কালে। শুধু তাই নয়, কোরাণের বর্ণনামতে, উপরোক্ত ছয়টি সমকালের মধ্যেই মহাকাশের বস্তুনিশ্চয়ও সৃষ্টি হয়েছিলো; এবং উক্ত সময়কালের মধ্যেই পৃথিবীর যাবতীয় উন্নয়ন কর্ম এমনভাবে সম্পাদিত হয়েছিলো—যদ্দরুন এই গ্রহটি (জীবনধারণের যাবতীয় উপকরণসহ) মনুষ্য বসবাসের উপযোগী হতে পেরেছে। কোরাণের বর্ণনা মতে, পৃথিবীর এইসব উন্নয়নমুলক কর্মকান্ড সম্পাদিত হয়েছিলো চারটি সময়কালের মধ্যে। কোরাণের এই চারটি সময়কালের বর্ণনা থেকে যে-কারো মনে আধুনিক বিজ্ঞানের দ্বারা প্রমানিত মানুষের আবির্ভাবের চারটি ভূতাত্ত্বিক পর্যায়ের কথা উদয় হওয়ে স্বাভাবিক। আমরা সবাই জানি, পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের কালে কিভাবে চারটি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়েছিলো। বলা অনাবশ্যক যে, পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব-সংক্রান্ত এই চারটি পর্যায় বা সময়কাল হচ্ছে বিজ্ঞানের একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা বা Hypothesis। তবে, বাস্তবে সেই চারটি পর্যায়ে যে কি ঘটেছিলো, সে বিষয়ে বিজ্ঞানের নিকট সঠিক কোন তথ্য নেই।
এই প্রসঙ্গে আরো বলে নেওয়া দরকার যে, কোরাণের ৪১ নং সুরার ৯ থেকে ১২ নং আয়াতের বর্ণনানুসারে মহাকাশের বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্র ও পৃথিবী পরিগঠিত হয়েছিলো দুইটি সময়কালে বা পর্যায়ে। এক্ষেত্রে আমরা সূর্য এবং তার উপসৃষ্টি, বিশেষতঃ পৃথিবীর সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করতে পারি। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানের পরিবেশিত তথ্য হল, গ্রহ-নক্ষত্র ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্ম সম্পাদিত হয়েছিলো দু’টি পর্যায়ে। এক, আদি নিহারিকার ঘনিভুত হওয়ার ঘটনায়; এবং দুই, সেই নিহারিকার বিভক্ত বা টুকরা হওয়ার ঘটনায়। বিজ্ঞানের এই তথ্য সুতরাং কোরাণের বর্ণনার সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে। কোরাণে পরিস্কারভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, সৃষ্টির এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো – মহাকাশের ধুম্রমন্ডলীর দ্রবণ এবং পরবর্তী পর্যায়ে তার বিভক্তির মধ্য দিয়ে। অতএব, এক্ষেত্রে আমরা কোরাণের বর্ণনা ও বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তথ্যের মধ্যে পুরোপুরি মিল অর্থাৎ সঙ্গতি দেখতে পাচ্ছি।
২. বিজ্ঞান জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও তার গ্রহ সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার দুটি পর্যায়ে ছিলো পরস্পর সংলগ্ন। এদিকে এই দুই সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার ঘটনা ওতোপ্রতোভাবে জড়িত থাকার বিষয়টাও কোরাণের আয়ারতের দ্বারা প্রমানিত ও সাব্যস্ত হচ্ছে এবং আমরা তা ইতিমধ্যে পর্যালোচনাও করেছি।
৩. কোরাণে বলা হয়েছে, মহাবিশ্বের সৃষ্টির আদি-পর্যায়ে ছিলো ‘ধুম্রকুন্ডলী’। অর্থাৎ সৃষ্ট বস্তুসমুহ এই পর্যায়ে ছিল প্রধানত গ্যাসীয় অবস্থায়। বিজ্ঞানও বলছে, সৃষ্টির আদি ছিলো নিহারিকা বা ‘নেবুলা’—যা মুলত গ্যাসীয় ধুম্রকুন্ডলীর অনুরুপ। সুতরাং এক্ষেত্রেও কোরাণের বক্তব্য বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তথ্যের সাথে পুরোপুরিভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই সাব্যস্ত হচ্ছে।
৪. কোরাণে ৭ সংখ্যার উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, আকাশের সংখ্যা একাধিক বা অনেক। এই সাত সংখ্যার অর্থ ও তাৎপর্য আমরা ইতিপুর্বে আলোচনা করেছি। আধুনিক বিজ্ঞানও জানাচ্ছে যে, মহাশুন্য-পদার্থবিজ্ঞানের পর্যক্ষকবৃন্দ গ্যালাকটিক সিস্টেম বা ছায়াপথ-পদ্ধতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে লক্ষ কোটি গ্রহ-নক্ষত্র সম্বলিত আসমান তথা মহাশুন্যের অস্তিত্ব প্রমান করেছেন। তারা এও দেখেছে ছায়াপথের সংখ্যা বহু। সুতরাং এক্ষেত্রে কোরাণের বক্তব্য আধুনিক বিজ্ঞানের দ্বারা সত্য বলে প্রমানিত হচ্ছে। পক্ষান্তরে, আমাদের পৃথিবীর মত একাধিক গ্রহের অস্তিত্বের কথা কোরাণের বিভিন্ন আয়াতে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞান এই সম্পর্কে এখনো তেমন কোন প্রমান দিতে পারছেনা। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা এই যে, বহু ‘পৃথিবীর’ অস্তিত্ব খুবই সম্ভব।
৫. কোরাণে ‘আকাশসমুহ’ তথা ছায়াপথ ও ‘পৃথিবী’র মাঝখানে অর্থাৎ এতদুভয়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ে সৃষ্ট-বস্তুর অস্তিত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে। মহাকাশের জ্যোতির্বিজ্ঞান-পদ্ধতির সুসংগঠিত ধারার বাইরে সেতু বা সংযোজনকারী হিসাবে অবস্থিত বস্তু বা পদার্থনিচয়কে আমরা অনায়াসেই আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর মাঝখানে অবস্থিত সেই সৃষ্ট-বস্তু হিসেবে শনাক্ত করতে পারি।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, যদিও কোরাণে বর্ণিত বিশ্বসৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায়-সংক্রান্ত বক্তব্যের সবটা আধুনিক বিজ্ঞান নিজস্ব তথ্য ও পরিসংখ্যান দ্বারা প্রমানিত ও সাব্যস্ত করতে পারছেনা; কিন্তু বিশ্বসৃষ্টি-সংক্রান্ত বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত তথ্যের কোন বিরোধী বানী কিংবা বক্তব্য আমরা এ যাবৎ কোরাণে পাচ্ছিনা। কোরাণের এসব বাণী ও বক্তব্য, সুতরাং, ওহী প্রাপ্ত বাণী হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার অধিকারী। কেননা আমরা দেখেছি, বিশ্বসৃষ্টি সম্পর্কে বাইবেলের পুরাতন নিয়মে যেসন বক্তব্য বিদ্যমান, বিজ্ঞানের তথ্য-প্রমানের আলোকে তা এটাও গ্রহণযোগ্য নয়। অবশ্য এতে বিস্মিত হওয়ার তেমন কিছু নাই। কেননা বাইবেলের যে সেকেরডোটাল পাঠ থেকে আমরা বিশ্বসৃষ্টি সম্বন্ধে যেসব বক্তব্য পাচ্ছি সেসব রচিত হয়েছিল ইহুদিদের ব্যবিলন থেকে উৎখাতের প্রাক্কালে—পুরোহিতদের দ্বারা। এই পুরোহিতরা সে সময়ে এমনভাবে বাইবেলের এসব বাণী রচনা করেছিলেন, যেসব বাণীতে তাদের নিজেদের মনমত ধর্মতাত্বিক অভিমতই শুধু প্রতিফলিত হতে পেরেছিলো। তাছাড়া বিশ্বসৃষ্টি সম্পর্কে বাইবেলের বক্তব্যের সাথে কোরাণের বক্তব্যের এই যে দুস্তর ব্যাবধান-- তা আরও একটি কারণে সবিশেষ গুরুত্বলাভের অধিকারী। তাহলো, ইসলামের শুরু থেকেই মোহাম্মদের (দঃ) বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উত্থাপন করে আসা হচ্ছে যে, তিনি বাইবেলের বর্ণনা হুবহু নকল করে কোরান রচনা করেছিলেন। কিন্তু কোরাণের বাণী ও বাইবেলের বক্তব্যের মধ্যে উপরে বর্ণিত ব্যাবধানই প্রমান করছে যে, এই অভিযোগ একান্ত অমুলক। বিশেষত বিশ্বসৃষ্টির ব্যাপারে বাইবেল ও কোরাণের বানীর এই আলোচনার দ্বারা এটাই প্রমানিত হয় যে, মোহাম্মদের (দঃ) বিরুদ্ধে উত্থাপিত উপরোক্ত অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন। আর যদি এই অভিযোগ সত্য বলে ধরে নেওয়া হয় – তাহলে সে অবস্থায় এখানে যে প্রশ্নটি না জেগে পারেনা, তা হলোঃ চৌদ্দশত বছর আগে আবির্ভুত হয়ে কি করে একজন মানুষের পক্ষে বাইবেলের বাণীর ভুল-ত্রুটি যথাযথভাবে সংশোধন করা সম্ভব? কিভাবে তার পক্ষে সম্পূর্ণ নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি মোতাবেক বাইবেল থেকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ত্রুটিপূর্ণ বাণীসমুহ বাদ দিয়ে এমন সব বাণী ও বক্তব্য রচনা করে কোরাণে সন্নিবেশিত করা সম্ভব—যা এতদিন—এতকাল পরে কেবলমাত্র আজকের বিজ্ঞানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষনার সত্য বলে প্রমানিত হতে পারছে? সুতরাং ‘কোরাণ মোহাম্মদের (দঃ) নিজস্ব রচনা’ কিংবা তিনি ‘বাইবেলের বাণী থেকে নকল করে কোরাণের বাণী তৈরি করেছিলেন’ বলে যে ধারণা পোষন করা হয় – সে ধারণা আদৌ সত্য ও সমর্থনযোগ্য নয়। কেননা, বিশ্বসৃষ্টি-সম্পর্কিত কোরাণের বানী ও বর্ণনা – বাইবেলের বাণী ও বক্তব্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
(From ‘The Bible, The Qur’an and Science’ by Dr. Maurice Bucaille.)
চলবে...