|| বাংলার নবাবের ওয়েবসাইটে স্বাগতম ||
আমি রুষে উঠে যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া | ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া।
স্বাধীনতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
স্বাধীনতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৬

মধুর ক্যান্টিনের প্রতিষ্ঠাতা মধুসূদন দে’র জন্মবার্ষিকী

শফিক রেহমান
শাহবাগে একসময়ে যেটা রূপসী বাংলা হোটেল এবং তার আগে সুদীর্ঘকাল শেরাটন হোটেল নামে পরিচিত ছিল সেটার জন্ম হয়েছিল ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা রূপে। ঢাকার এই হোটেলের মালিকানা সব সময়ই ছিল সরকারের কিন্তু হোটেল ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব ছিল অন্যদের। যেমন, এখন আবার এই হোটেলের ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব ফিরে পেয়েছে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলস গ্রুপ, যেটি একটি মালটিন্যাশনাল কম্পানি এবং যার হেড কোয়ার্টার্স এখন ডেনহ্যাম, ইংল্যান্ডে। অতীতে এই মালটিন্যাশনাল কম্পানির হেড কোয়ার্টার্স ছিল নিউ ইয়র্কে। ঢাকায় ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের ব্যাপক সংস্কার কাজ এখন চলছে। কিছুকাল পরে নতুন রূপে সেজে ইন্টারকন্টিনেন্টাল আবার আত্মপ্রকাশ করবে।

সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০১৫

মাই ফ্রেন্ডস্‌... মাই ফ্রেন্ডশীপ... মাই ফ্রেন্ডশীপ ডে ...


... যখন প্রেম করতাম, ক্যাম্পাসে বসে দূজনে সারাদিন শুধু গল্প আর গল্প। কী গল্প যে করতাম জানিনা। কিন্তু সকাল গড়িয়ে দূপুর পেরিয়ে কখন যে বিকাল হয়ে যেতো, টেরই পেতাম না! 

এভাবে চললো দীর্ঘ সাত বছর। এখনো আমরা গল্প করি। সন্ধ্যায় আপিস থেকে ফিরে সেই যে গল্প শুরু; কখন যে রাত ২/৩টা বেজে যায়!! শেষে সকাল বেলা আপিসে দেরী! শী ওয়াজ, ইজ এ্যান্ড উয়ীল অলওয়েজ বী মাই বেস্ট ফ্রেন্ড।

... শুরুটা ইউনিতে ভর্তির দিন থেকে। 
    : “ki koro”
    : “walking..”
    : “where to where” 
    : “nowhere to nowher” 
এ্যাক্‌টেল –এর ফ্রী মেসেজের সেই দিনগুলো পেরিয়ে শুরু হলো ইউনি’র ক্লাস। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে গল্প, আড্ডা, গান ... কিভাবে যে প্রাণে মিসে গেছিস! ইউ আর নো মোর মাই ফ্রেন্ড। ইউ আর মাই ব্রো, মাই গার্ডিয়ান। আই ডু লাভ দী, Shoab। 

... বাপ, মনে পড়ে ক্যাম্পাসের ডাবল বেঞ্চ বসে গলা ফাটিয়ে আমাদের গান!! “ভালোবাসি বলেরে বন্ধু......”!! তোকে ভালোবাসি বাপ। ইউ আর মাই ট্রু ফ্রেন্ড।

রবিবার, ২১ জুন, ২০১৫

বাংলাদেশের নায়কেরাঃ ড. জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরী

ছবিঋণঃ ম্যাগাসেইসে সাইট
এই মানুষটা বা এই বিষয়টা নিয়ে লিখবোনা ভেবেছিলাম। কারণ কিছু না, আমাকে সব বিষয়ে লিখতে হবে এমন তো নয়!

তবে, আমার নিউজফিডে ঘুরে ফিরে এসেছেন তিনি। সত্যি বলতে কি ‘উনি গনস্বাস্থ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা’, আমি কেবল এইটুকুই জানতাম!

বলছি ড. জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরীর কথা।

১৯৬৪ সালে এম্‌বিবিএস পাস করার পর পোস্ট-গ্র্যাড অর্জনের জন্য ইউকে গমন করেন। ৭১-এ যখন বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়, তিনি লন্ডনে ‘সার্জিক্যাল ট্রেইনিং’ –এ ছিলেন। দেশে ফিরেই যুদ্ধে যোগ দেন এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার্থে একটি ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।  

স্থানীয় গ্রাম্য মানুষজনও সেই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে থাকে। পূর্বের কোন ট্রেইনিং না থাকা গ্রাম্য মহিলাদেরকে অল্পসময়ের মধ্যে ট্রেইনিং প্রদান করে রোগীর শূশ্রুষার ব্যাবস্থা করেন ড. জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরী।

মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০১৫

আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ
এই কী মানুষজন্ম? নাকি শেষ
পরোহিত-কঙ্কালের পাশা খেলা! প্রতি সন্ধ্যেবেলা
আমার বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে ওঠে, হৃদয়কে অবহেলা
করে রক্ত; আমি মানুষের পায়ের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে
থাকি-তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে। আমি আক্রোশে
হেসে উঠি না, আমি ছারপোকার পাশে ছারপোকা হয়ে হাঁটি,
মশা হয়ে উড়ি একদল মশার সঙ্গে; খাঁটি
অন্ধকারে স্ত্রীলোকের খুব মধ্যে ডুব দিয়ে দেখেছি দেশলাই জ্বেলে-
(ও-গাঁয়ে আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই!)

রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৫

বর্ষবরণে টিএসসিতে শ্লীলতাহানিঃ বাস্তবতা ও করণীয়

সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, শয়তানগুলোর ছবি। সবই চলে এসেছে সামনে।
এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, উপযুক্ত শাস্তির।

তবে, প্রথম আলো অলরেডি এটাকে মৌলবাদী রুপ(১) দেয়ার প্রয়াস নিয়েছে, ডিএমপি স্পোকস্-পার্সন অলরেডি বলে দিয়েছেন ফুটেজে তারা কোন এ্যাসাল্টের ঘটনা(২) পান নাই।

এটা হয়তো আরেকটা থার্টি ফাস্টের ঘটনা হতে যাচ্ছে। মনে পড়ে ২০০০ সালে বাঁধনকে লাঞ্চিত করার ঘটনা? এতদিনেও তার কোন বিচার হয়নি, সাজা পাইনি কেউই। অথচ, নেট সার্চ দিলে সেই ঘটনার ছবি এখনো পাওয়া যায়! ছবি আছে, ছবির মানুষটি আছে। কিন্তু, তাকে সাজা দেয়ার সুযোগ নেই!!

অপরাধ অনেকটা রিকারিং ইভেন্টের মত। উপযুক্ত শাস্তির ব্যাবস্থা না করলে তা বারংবার ঘটতে থাকে, আগের চে' আরও ভয়ংকর রুপে।

রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১২

১৬ই ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস

আজ ১৬ই ডিসেম্বর ২০১২। মহান বিজয় দিবস। জাতি আজ তাঁর ৪১তম বিজয় দিবস উদযাপন করছে। সারা বাংলাদেশ জুড়ে দিনটিকে উদযাপনের জন্য নানা কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ আজ তাঁর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ করছে গভীর শ্রদ্ধাচিত্তে। 


সোমবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১১

ইউ'ল নেভার গেট দ্য সেকন্ড চান্স টু মেইক দ্য ফার্স্ট ইম্প্রেশান


জয়েনিং লেটার হাতে পেয়ে খুশি হয়না এমন মানুষ কি খুঁজে পাওয়া সম্ভব? বলছি না যে আমি এর ব্যাতিক্রম। আমিও অনেক আনন্দিত হয়েছিলাম। কিন্তু সেই আনন্দকে দীর্ঘস্থায়ী করার খুব একটা সুযোগ আমার ছিলোনা। জয়েনের জন্য প্রয়োজনীয় দলিলাদি সংগ্রহ, দুজন গেজেটেড অফিসারের সন্ধান করা, ইন্ট্রোডিউসারের জন্য জয়েন করাটা প্রায় পিছিয়ে যাওয়া (যদিও শেষ পর্যন্ত পিছায়নি), অবশেষে জয়েন করা, পোস্টিং পাওয়া, নতুন অফিসে যাওয়া -- এসবই তো হলো ৩১তম বিসিএস-এর রিটেন এক্সাম চলাকালীন সময়ে। দম ফেলার ফুরসৎ ছিলোনা।
সারাদিনের কাজ শেষে বাসায় ফিরে রাতে পরের দিনের এক্সামের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। বেশ নিরন্তর পরশ্রম বলা চলে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তো থাকতাম এক্সাম হলে, বিকালে জয়েন করার জন্য জনতা ব্যাংক লিমিটেডের খুলনা এরিয়া অফিসে; আর রাতে বাড়ি ফেরা। তবে এগারো তারিখের (অক্টোবর '১১) কথা বলতেই হয়। কি ধকলই না গিয়েছিলো এদিন! এখান থেকে ওখানে, ওখান থেকে সেখানে। শুধু ছুটোছুটি। ধন্যবাদ দিয়ে শোয়েবকে ছোট করবোনা। সারাটা দিন ও আমার সাথে ছিলো, ওর পঙ্খীরাজে চড়েই দিনের ছূটোছুটির সমাপ্তি টানতে পেরেছিলাম। এগারই অক্টোবর ২০১১ -আমার জন্য তাই অতীব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম চাকরির জয়েনিং।
আমার ব্রাঞ্চে জয়েন করেছিলাম তের (১৩) তারিখে। তখনো এক্সাম চলছিলো। বিসিএসের এক্সাম শেষ হওয়ার একদিন পরেই ছিলো মিডটার্ম (এমবিএ থার্ড টার্ম) এক্সাম। “নতুন চাকরী বা নতুন অফিস কেমন লাগছে?”-- এটা একটা কমন কোয়েশ্চান। আমার জন্য উত্তর দেয়াটা অবশ্য খুব সিম্পল ছিলো। “ভালো, বেশ ভালো”। এই ভালো বলাটা শুধু এজন্যই নয় যে এটা আমার প্রথম চাকরী। বরং, ভালোলাগার মতই ভালো। কিছু কারণ অবশ্য রয়েছে।
“ইউ উইল নেভার গেট দ্য সেকন্ড চান্স টু মেক দ্য ফার্স্ট ইম্প্রেশান”। কথাটা খুব মেনে চলি আমি। আর হ্যাঁ, প্রথম সাক্ষাতেই আমি ইম্প্রেস করেছিলাম আমার ম্যানেজারকে। ব্যাস হয়ে গেলো। ওটুকুই যথেষ্ট। ম্যানেজার ইম্প্রেস্‌ড্‌, আমিও তার কেয়ারে ইম্প্রেস্‌ড্‌।
আরেকটা বিশেষ কারণের কথা বলতেই হয়। ভবঘুরে জিবনে সারাদিন সময় কাটতো চ্যাটিং আর সোস্যাল নেটওয়ার্কিং করে। ভেবেছিলুম, অন্তত দিনের বেলাতে এগুলোকে বিদায় জানাতে হবে। কিন্তু ম্যানেজারের কল্যাণে সেটা পেয়েছিলাম আমার চাকরী জিবনের তৃতীয় দিনেই। অলটাইম ফ্রি একসেস্‌ টু আনলিমিটেড ইন্টারনেট। আমার মত নেটিজেনের জন্য আর চে' আনন্দের খবর আর কি হতে পারে?
সেই থেকেই চলছে। অফিসওয়ার্ক আর চ্যাটিং-নেটওয়ার্কিং... ভালোই চলছে গুরু!
ও হ্যাঁ, একটা কথা বলতেই ভুলে গিয়েছিলাম। আমার পোস্টিং দিয়েছে আমার বাড়ির পাশে। সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ রগড়াতে রগড়াতে অফিসে যাই... আর সন্ধ্যায় হাট হাটতে ফিরি। মন্দ না।  

মঙ্গলবার, ৮ জুন, ২০১০

আমার দেশ-এর টার্নিং পয়েন্টঃ প্রকাশনা নিষিদ্ধ

আমার দেশ-এর টার্নিং পয়েন্টঃ প্রকাশনা নিষিদ্ধ

শফিক রেহমান

কিছু কাল জুড়ে শোনা যাচ্ছিল বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের কর্মসূচিতে বিদ্যুৎ-গ্যাস এবং পানি নয়- যে দুটি বিষয় অগ্রাধিকার পাচ্ছে তা হলো, এক. ক্যান্টনমেন্টে যে বাড়িতে সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ম্যাডাম খালেদা জিয়া বসবাস করছেন, সেখান থেকে তাকে উৎখাত করা এবং দুই. দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও লেখক মাহমুদুর রহমানকে জেলে নেয়া।

চলমান বিদ্যুৎ-গ্যাস ও পানি সংকটের চাইতেও আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে গভীরতর সংকট হয়েছে খালেদা জিয়ার বাসস্থান এবং মাহমুদুর রহমানের দৈনিক পত্রিকা, এমনটা অনেকেই বিশ্বাস করছিলেন না। একটি বাড়ি এবং একটি পত্রিকা আওয়ামী লীগ সরকারকে এমনই দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে যে, তারা বিদ্যুৎ-গ্যাস ও পানির অভাব, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, কর্মসংস্থানের নিম্নগতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মোকাবিলার বদলে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে শুধু ওই দুটি বিষয় সর্বাগ্রে মোকাবিলার জন্য? এটা বিশ্বাস করতে অনেকের কষ্ট হলেও গত সপ্তাহে মাহমুদুর রহমানকে সত্যিই জেলবন্দী করা, দৈনিক আমার দেশ-এর প্রেস গালাসিল করে দেয়া এবং আমার দেশ পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়েছে। এ সবই ঘটেছে মঙ্গলবার ১ জুন ২০১০-এর বিকেল পাচটা থেকে পরবর্তী ১১ ঘণ্টার মধ্যে।
ওই দিন দুপুর থেকেই মোবাইল ফোন ও এসএমএস-এর রিং টোনের সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছিল একটি সংবাদঃ আজ মাহমুদুর রহমান গ্রেফতার হবেন ও আমার দেশ বন্ধ হয়ে যাবে।

কেউ যদি জানতে চান এই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার খবরটির ভিত্তিটা কি, তাহলে উত্তর আসে আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশক ও মুদ্রাকর মোহাম্মদ হাসমত আলীকে একটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আটকে রেখেছে তাদের অফিসে। তখনই আমার মনে পড়ে গেল ১৯৮৫ এবং ১৯৮৬-তে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন নিষিদ্ধ ঘোষিত হবার পূর্ব সময়গুলো। তফাৎ এই যে, তখন বাংলাদেশে মোবাইল ফোন যুগ ছিল না। ফলে খুব কম সংখ্যক ব্যক্তিই জানতেন সরকার কিভাবে দমনপীড়ন কাজগুলো করবে। সুদীর্ঘ পঁচিশ বছর পরে আবার সেই প্রক্রিয়াটি কিভাবে সম্পন্ন হতে চলেছে সেটা জানার জন্য বিকেল চারটার সময়ে আমি চলে যাই কাওরানবাজারে এয়ারপোর্ট রোডের ইসপাত ভবনের এগারো তলায় আমার দেশ-এর সম্পাদকের অফিসে।

মাহমুদুর রহমানের সাথে একাত্মতা প্রকাশের জন্য কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মাহমুদুর রহমান তাদের বলেন, তিনি খবর পেয়েছেন হাসমত আলীকে একটি গোয়েন্দা সংস্থার অফিসে কয়েক ঘণ্টা আটক রাখার পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তবে ছেড়ে দেয়ার আগে দুটি শাদা কাগজে হাসমত আলীকে সই দিতে হয়েছে।

সাবেক এমপি মোসাদ্দেক আলী ফালুর ভাই আলহাজ্ব মোহাম্মদ হাসমত আলী আমার দেশ পত্রিকার সূচনালগ্ন থেকে প্রকাশক ও মুদ্রাকরের দায়িত্ব পালন করছিলেন। যেসব পাঠক পত্রিকা প্রকাশের আইনগত মারপ্যাচ জানেন না, তাদের এখানে জানিয়ে রাখছি, একটি পত্রিকার টাইটেল বা নামের মালিক হন পত্রিকাটির প্রকাশক ও মুদ্রাকর। এ জন্য প্রকাশের আগে স্থানীয় ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার (ডিসি)-এর মাধ্যমে তাকে আবেদন করতে হয় সরকারের কাছে যে, তিনি একটি পত্রিকা প্রকাশে ইচ্ছুক। এরপর সেই ব্যক্তির বিভিন্ন যোগ্যতা সম্পর্কে পুলিশের সেপশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) তাদের তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করে এবং তাদের রিপোর্ট ডিসি অফিসে পেশ করে। ওই রিপোর্ট যদি ভালো হয় অর্থাৎ সরকারের মনোঃপূত হয় তাহলে নির্ধারিত দিনে আবেদনকারীকে সশরীরে উপস্থিত হতে হয় ডিসি অফিসে। সেখানে ডিসির সামনে তাকে ফর্ম-বি নামে একটি ঘোষণাপত্রে সই করতে হয়। এই ঘোষণাপত্রে লেখা থাকেঃ
আমি, এই মর্মে আরও ঘোষণা করিতেছি যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ অথবা বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থের প্রতিকূলে এমন কোন অপরাধজনক বা আপত্তিকর বিষয় আমার উপরোক্ত পত্রিকায় মুদ্রণ বা প্রকাশে বিরত থাকিব এবং বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত ১৯৭৩ সালের ছাপাখানা ও প্রকাশনা (ডিক্লারেশন ও রেজিস্ট্রেশন) আইনের নিয়মাবলী মানিয়া চলিতে বাধ্য থাকিব।

এটিকেই বলা হয় ডিক্লারেশন। এই ডিক্লারেশনের পর থেকে আবেদনকারী পত্রিকাটির নামের একক মালিক বা সোল প্রোপ্রাইটর হয়ে যান- তিনি পত্রিকাটি প্রকাশ করুন আর নাই করুন। এই মালিকানার কোনো ভাগাভাগি বা অংশীদারিত্ব সম্ভব নয়।
দৈনিক ইত্তেফাক-এর প্রকাশনা সংকট ছিল এখানেই। দুই ভাইয়ের প্রচণ্ড বিরোধ মীমাংসার লক্ষ্যে ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠানটির সকল সম্পদ ভাগাভাগি করা গেলেও ইত্তেফাক নাম, যা টাইটেল বা ডিক্লারেশনের ভাগাভাগি সম্ভব ছিল না। তাই সম্প্রতি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু দশ কোটি টাকার বিনিময়ে তার বড় ভাই মইনুল হোসেনের কাছ থেকে ইত্তেফাক টাইটেলটি ফেরত নিয়েছেন এবং তিনিই এখন এককভাবে দৈনিক ইত্তেফাকের মালিক।

প্রকাশক ও মুদ্রাকরের পক্ষে যদি কোনো কারণে সেই দায়িত্ব পালন অসম্ভব হয়ে পড়ে তাহলে প্রায় একই পক্রিয়ায় তাকে আবার ডিসির সামনে সশরীরে উপস্থিত হয়ে আরেকটি ঘোষণাপত্রে (ফরম সি) সই দিয়ে তার অপারগতা জানাতে হয়। যদি পত্রিকাটির প্রকাশনা চলমান থাকে তাহলে একই প্রক্রিয়ায় পত্রিকাটির নতুন প্রকাশক ও মুদ্রাকরকে ফরম বি-তে সই করতে হয় এবং তারপর থেকে তিনিই হন নতুন মালিক।

এখানে পাঠকদের জানিয়ে রাখছি, পত্রিকার প্রকাশক ও মুদ্রাকরই নিয়োগ করেন পত্রিকার সম্পাদককে। তবে তার আগে এসবি-র ক্লিয়ারেন্স নিতে হয়। কোনো কারণে যদি সম্পাদক তার পদ ছেড়ে দেন বা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন, তাহলে তিনি একজন নতুন সম্পাদক, অথবা কোনো নতুন সম্পাদককে পাওয়া সম্ভব না হলে একজন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নিয়োগ করে পত্রিকার প্রকাশনা চলমান রাখতে পারেন মালিক। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত প্রকাশক ও মুদ্রাকর নিয়োগ সম্ভব নয়।

আর এখানেই সরকার সমস্যায় ফেলতে চেয়েছে মাহমুদুর রহমানকে। সরকার অভিযোগ করেছে তিনি ডিক্লারেশন সম্পর্কিত আইন মেনে চলেননি এবং তাই আমার দেশ পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়েছে।

আমার দেশ পত্রিকার প্রিন্টার্স লাইনে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রূপে মাহমুদুর রহমানের নাম এবং প্রকাশক ও মুদ্রাকর রূপে আলহাজ্ব মোহাম্মদ হাসমত আলীর নাম ছিল।
মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার, জাপানে সিরামিকসে টেকনিকাল শিক্ষাপ্রাপ্ত মাহমুদুর রহমান মেথডিকাল ব্যক্তি ও সফল ব্যবসায়ী। তিনি সেদিন তার অফিসে আহূত প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে গত প্রায় এক বছরে এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে তার চলমান যোগাযোগের কথা জানান এবং প্রমাণস্বরূপ তিনি বিভিন্ন ডকুমেন্টস দেখান। তার এসব ডকুমেন্টস এবং পরবর্তীতে বিবিসিতে প্রচারিত ডিসির ইন্টারভিউ থেকে নিচের টাইমলাইনটি জানা যায়।

ডিক্লারেশন সমস্যার টাইমলাইন
২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৪ দৈনিক আমার দেশ প্রকাশিত।
আগস্ট ২০০৮ঃ মোসাদ্দেক আলী ফালু জেলে বন্দী এবং আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড গভীর আর্থিক সংকটে নিপতিত। মাহমুদুর রহমান ও তার কিছু পার্টনার এই সংকট মোচন করে প্রকাশনা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেন।
১৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮ ঃ আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড-এর শেয়ার মালিকানা হস্তান্তর সম্পর্কিত দলিল স্বাক্ষরিত হয়।

৬ অক্টোবর ২০০৮ ঃ আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের নতুন চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান কার্যভার গ্রহণ করেন।

১৫ মে ২০০৯ ঃ আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আতাউস সামাদ পদত্যাগ করেন।
২৬ এপ্রিল ২০০৯ ঃ আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড একটি চিঠি দিয়ে ঢাকার ডিসিকে জানিয়ে দেয় বোর্ড অফ ডিরেকটর্সের সিদ্ধান্ত মোকাবেক চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নিযুক্ত হয়েছেন।

১৬ জুন ২০০৯ ঃ ডিসির পক্ষে ঢাকার বিশেষ পুলিশ সুপার আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডকে জানান যে, নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের বিষয়ে ডিসির আপত্তি নেই।

৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ ঃ মুদ্রণালয়ের নিয়ন্ত্রক ও মুদ্রাকরের নাম বদলের জন্য আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড আবেদন করে ডিসির কাছে এবং আইনের বিধান অনুযায়ী এই বদলের বিষয়ে আদালতে ঘোষণাপত্র দেয়। একই সঙ্গে পত্রিকার প্রকাশক বদল করে নতুন প্রকাশকরূপে মাহমুদুর রহমানের দায়িত্ব নেয়ার বিষয়টিও ডিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।

১১ অক্টোবর ২০০৯ ঃ সাবেক প্রকাশক হাসমত আলী ডিসি অফিসে গিয়ে ফর্ম সি-তে সই করে ঘোষণা দেন যে, তিনি প্রকাশকের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন।

৪ নভেম্বর ২০০৯ ঃ ডিপার্টমেন্ট অফ ফিল্মস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স (ডিএফপি বা চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতর) প্রকাশক বিষয়ে অনাপত্তিপত্র দেয়। ডিএফপির ডেপুটি ডিরেক্টর মাসুদা খাতুন স্বাক্ষরিত এই পত্রে বলা হয়, ’আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশক আলহাজ্ব মোহামমদ হাসমত আলীর পরিবর্তে জনাব মাহমুদুর রহমানের নাম প্রতিস্থাপন করার অনুমোদন দেয়া যেতে পারে।’

১৫ মার্চ ২০১০ ঃ ঢাকার ডিসি একটি চিঠিতে আমার দেশ পাবলিকেশন লিমিটেডের কাছে জানতে চান যে, কেন এখনো দৈনিক আমার দেশের প্রিন্টার্স লাইনে প্রকাশকরূপে হাসমত আলীর নাম ছাপা হচ্ছে? উত্তরে আমার দেশ তাদের চিঠিতে জানায় যে, ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯-এর চিঠিতে ডিসিকে মুদ্রণালয়ের নিয়ন্ত্রক-মুদ্রাকর ও প্রকাশক বদল বিষয়ে জানানো হলেও এখনো এ বিষয়ে আপত্তি বা অনাপত্তি জানানো হয়নি। সুতরাং প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা থাকার কারণে এখনো আগের প্রকাশকের নামই প্রিন্টার্স লাইনে ছাপা হচ্ছে। একই সঙ্গে ডিসিকে আমার দেশ পাবলিকেশন লিমিটেড অনুরোধ জানায় খুব দ্রুত তাদের আবেদন নিষ্পত্তি করতে।
১ জুন ২০১০ ঃ সকাল নয়টায় জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসআই) সদস্যরা হাসমত আলীর শাহজাহানপুরের বাসা থেকে তাকে ধরে নিয়ে যান। বেলা দুইটার সময়ে হাসমত আলী দুটি কাগজে সই করার পর পাচ ঘণ্টার বন্দীদশা থেকে মুক্তি পান। হাসমত আলী জানান, এই একটি কাগজ ঢাকার ডিসিকে এবং অপর কাগজটি তেজগাও শিল্পাঞ্চল থানার ওসিকে লেখা। ওই দুটি কাগজে লেখা রয়েছে, ’তিনি (হাসমত আলী) আমার দেশের প্রকাশক নন। তার নাম ছাপা হওয়ায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হোক।’

উল্লেখ্য, তেজগাও শিল্পাঞ্চলে আমার দেশ-এর ছাপাখানা অবস্থিত। কিন্তু সংবাদ সংস্থা বিডি নিউজ জানায় এনএসআইয়ের কর্মকর্তাদের কেউ হাসমত আলীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সত্যতা স্বীকার করেননি।

এ খবর জানার সঙ্গে সঙ্গে মাহমুদুর রহমান কাওরানবাজারে অবস্থিত আমার দেশ-এর কার্যালয়ে চলে আসেন এবং অচিরেই গ্রেফতার হতে পারেন আশঙ্কা করে বিকেল পাচটায় সেখানে প্রেস কনফারেন্স ডেকে সরকারি কার্যক্রমকে পৃএম্পট (হড়প-পশহয়) করেন। অর্থাৎ আগেই তিনি তার পক্ষের বক্তব্য প্রকাশ করে দেন। এই প্রেস কনফারেন্সে একটি প্রশ্নের উত্তরে মাহমুদুর রহমান বলেন, ’সোমবার রাতে (৩১ মে) আমি শুনেছি দশ দিনের মধ্যে আমার দেশ বনধ করে আমাকে অ্যারেস্ট করা হবে। কিন্তু আমি একে গুজব বলে এড়িয়ে যাই। কিন্তু আজ দেখছি সেটা গুজব নয়। সে খবরই সত্য হতে যাচ্ছে।’
রাজধানীতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মাহমুদুর রহমানের আসন্ন গ্রেফতারের সংবাদ। আমার দেশ-এর কার্যালয়ে উপস্থিত হতে থাকেন উদ্বিগ্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মী, আইনজীবী, পেশাজীবী ও সমর্থকবৃন্দ।

রাত এগারোটায় প্রায় ৪০ জন পুলিশের একটি টিম ইসপাত ভবনে আমার দেশ অফিসের সামনে অবস্থান নেয় এবং জোর করে অফিসে ঢোকার চেষ্টা করে। পুলিশের তেজগাও জোনের ডিসি সেইদিন সনধ্যার পর মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলার কপি হাতে নিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার কাছে কোনো গ্রেফতার ওয়ারেন্ট না থাকায় আমার দেশ-এ কর্মরত সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ভেতরে ঢুকতে পুলিশকে বাধা দেন। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা জুড়ে চলে তীব্র বাকবিতণ্ডা এবং মাঝে মধ্যে ধাক্কাধাক্কি। এক পর্যায়ে পুলিশ ভেতরে খাবার ও পানির বোতল নিতে বাধা দেয়। কেটে দেয় অফিসের ডিশ লাইন।

ওদিকে ইসপাত ভবনের সামনে কয়েক শ আমার দেশ সমর্থক সমবেত হয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও স্লোগান দিতে শুরু করেন। পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়।

রাত সাড়ে তিনটায় তেজগাও জোনের ডিসির নেতৃত্বে দাঙ্গা পুলিশের একটি টিম জোর করে আমার দেশ কার্যালয়ে ঢোকে এবং সাংবাদিক ও কর্মীদের ওপর লাঠিচার্জ করে। রাত চারটায় পুলিশ মাহমুদুর রহমানকে গোয়েন্দা পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে চলে যায়।

ওদিকে তেজগাও শিল্পাঞ্চলে আমার দেশ-এর প্রেসে পুলিশ হানা দেয়। সেই মুহূর্তে আমার দেশ-এর ২ জুন ২০১০ সংখ্যার কয়েক হাজার কপি ছাপা হয়ে গিয়েছিল। পুলিশ সেসব কপি বাজেয়াফত করে এবং আমার দেশ প্রেস গালাসিল করে দেয়। উল্লেখ্য, এই একই প্রেসে বিএনপি সমর্থক দৈনিক দিনকালও ছাপা হতো। সরকার পক্ষ থেকে জানানো হয় দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল হয়ে গিয়েছে।

২ জুন ২০১০ ঃ দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা অপ্রকাশিত।
মাহমুদুর রহমানকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেটা জানার জন্য তার পরিবার, সাংবাদিকবৃন্দ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা উদ্বিগ্ন ছিলেন। গুজব ছড়িয়ে পড়ে তাকে ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে ডিজিএফআইয়ের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অসমর্থিত সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে তাকে ক্যান্টনমেন্ট থানার হাজতে রাখা হয়েছে।

এইদিন বিকেল পৌনে পাচটায় মাহমুদুর রহমানকে দুটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কড়া পাহারায় ঢাকার সিএমএম আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়।

মাহমুদুর রহমানের পক্ষে আইনজীবীরা বলেন, মাহমুদুর রহমান একজন সুশিক্ষিত ব্যক্তি। সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা ও একজন তুখোড় সাংবাদিক। ১/১১-এর পর দুই নেত্রীকে দেশ থেকে বিতাড়িত করার প্রচেষ্টা তিনি তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে রুখে দেন। ফলে দেশে গণতন্ত্র রক্ষা পায়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করে সরকার পত্রিকাটি বনধ করে দেয়। ফলে পাচ শতাধিক সাংবাদিক ও কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন। সরকারের বিরুদ্ধে পত্রিকায় লেখার কারণেই পত্রিকা বনেধর ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। পত্রিকার প্রকাশক পরিবর্তন বিষয়ে ২১/৮/১০ তারিখ থেকে বহুবার চেষ্টা করেও সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে তা করা সম্ভব হয়নি। হাসমত আলীকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে তাকে দিয়ে বাধ্য করে এ মামলা করা হয়েছে। এ মামলার ধারা জামিনযোগ্য হওয়ায় সরকার ষড়যন্ত্র করে নাটক সাজিয়ে পরে পুলিশের কর্তব্যকাজে বাধাদানের কথা উল্লেখ করে অন্য মামলায় পাচ দিনের রিমান্ড চায়। তাকে রিমান্ড বাতিল করে জামিন দিলে তিনি পলাতক হবেন না।

জামিনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, মাহমুদুর রহমান আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। পুলিশকে আটক করে মারধর করেছেন। তাকে জামিন না দিয়ে রিমান্ডে দেয়া হোক।

এর মধ্যে পুলিশকে ’মারধর ও কর্তব্য কাজে বাধা দান’ সংক্রান্ত একটি মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত রিমান্ড ও জামিন- উভয় আবেদনই নামঞ্জুর করেন এবং মাহমুদুর রহমানকে তিন দিনের মধ্যে জেল গেইটে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মামলা তদন্তকারীদের নির্দেশ দেন। একই আদালত হাসমত আলীর দায়ের করা প্রকাশনা বিষয়ে প্রতারণার মামলায় বিশ হাজার টাকা মুচলেকায় একজন স্থানীয় আইনজীবীর জিমমায় মাহমুদুর রহমানের জামিন মঞ্জুর করেন।

অর্থাৎ ২ জুন রাত মাহমুদুর রহমানকে জেলে কাটাতে হয়। একটি সূত্র জানিয়েছে তাকে কোনো ডিভিশন দেয়া হয়নি।

এই দিন দেশে ও বিদেশে মাহমুদুর রহমানের অ্যারেস্ট ও আমার দেশ বনধ হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। সংসদে বিএনপির এমপিরা ওয়াক আউট করেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, ’মানিক মিয়ার সাথে মোনায়েম খা-র সরকার যে আচরণ করেছিল, বর্তমান সরকার মাহমুদুর রহমানের সাথে একই আচরণ করেছে। ওয়ান-ইলেভেনের পর যে পরিবর্তন আশা করা হয়েছিল তা আসেনি।’
বিদেশে নিউ ইয়র্ক টাইমসে একটি দীর্ঘ রিপোর্টে এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক মনিটরিং সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স, এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন (সংক্ষেপে এএইচআরসি) এবং কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সংক্ষেপে সিপিজে) এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে।

৩ জুন ২০১০ ঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে তার কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টি দেখা করেন।

মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার ও আমার দেশ-এর প্রকাশনা বনধ বিষয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, পুলিশের আইজি নূর মোহামমদ এবং র্যাবের ডিজি হাসান মাহমুদ খন্দকার।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ শেখ হাসিনার সাথে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎকার বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং দেয়ার সময়ে জানান, রাষ্ট্রদূতকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশের সংবাদ মাধ্যম সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর রুদ্ধদ্বার বৈঠক বিষয়ে কোনো সরকারি বিবৃতি আসেনি। অবশ্য সে আশাও করা হয়নি।

কিন্তু জানা যায়, মাহমুদুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবারও পুলিশ পাচদিনের রিমান্ডের আবেদন করেছে। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে মাহমুদুর রহমানের উপস্থিতিতে ঢাকার মহানগর হাকিম মোহামমদ নজরুল ইসলাম ৭ জুন সোমবার শুনানির জন্য তারিখ ধার্য করেন।

অন্যদিকে মাহমুদুর রহমানকে কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তেজগাও থানার সাব ইন্সপেক্টর ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রেজাউল ইসলাম রেজা দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যান। কারা কর্তৃপক্ষ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাহমুদুর রহমানকে ৭ নম্বর সেল থেকে বের করে কারা প্রশাসনের অফিসের উত্তর পাশের খোলা বারান্দায় নিয়ে যান। জিজ্ঞাসাবাদের সময় কারাগারে একজন ডেপুটি জেলার ছাড়াও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিট থেকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়ে চলে ১টা ১৩ মিনিট পর্যন্ত। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাকে মাহমুদুর রহমান পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, আপনারা আমাকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করেছেন।

কারাগার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানা যায়, মাহমুদুর রহমানের কাছে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রেজাউল ইসলাম তেজগাও থানায় ২/৬/২০১০ তারিখে দায়ের হওয়া ২ নম্বর মামলার নথিপত্র দেখিয়ে জানতে চান, ’আপনার উপস্থিতিতে এ মামলার এজাহারভুক্ত অন্যান্য সাংবাদিক ও অজ্ঞাত কিছু ব্যক্তি সরকারি কাজে বাধা প্রদান করেন।’ মামলায় যাদের নাম রয়েছে ওই সব সাংবাদিকের নাম, পদবি ও ঠিকানা ঠিক আছে কি না তা জানতে চাওয়া হয়।

মাহমুদুর রহমান পুলিশ কর্মকর্তাকে জানান, মামলায় যাদের নাম উল্লেখ রয়েছে তারা সবাই তার পত্রিকার সাংবাদিক। এরপর তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে পুলিশ কর্মকর্তার কাছে জানতে চান, ’আপনারা (পুলিশ বাহিনী) অন্যায়ভাবে অফিসের একতলা থেকে ১৫ তলা পর্যন্ত পুলিশ দিয়ে চারদিক ঘিরে আমাদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। এক পর্যায়ে কোনো কারণ ছাড়াই সাংবাদিক ও কর্মচারীদের মারধর করেন। আবার আমাদের বিরুদ্ধেই আপনারা মামলা দিয়েছেন। মামলা তো আপনাদের বিরুদ্ধে হওয়া উচিত। আমরাই আপনাদের বিরুদ্ধে মামলা করব।’

তখন দারোগা চুপ হয়ে তার ডায়রিতে সংক্ষিপ্ত নোট লিখে কারাগার থেকে বেরিয়ে যান।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছাড়াও আমার দেশ-এর আরো তিনজন সিনিয়র সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা করেছে। এরা হচ্ছেন, সৈয়দ আবদাল আহমেদ (ডেপুটি সম্পাদক), জাহেদ চৌধুরী (সিটি সম্পাদক) ও সঞ্জীব চৌধুরী (সিনিয়র সহকারী সম্পাদক)।

শেখ হাসিনার লেভেলে
কেউ কেউ বলবেন মাহমুদুর রহমান ও আমার দেশ-এর এই তিন সাংবাদিক সৌভাগ্যবান বা লাকী ফোর! কারণ ১ জুন রাতে ওপরের নির্দেশে আমার দেশ পত্রিকা অফিস হামলাকারী পুলিশ যখন খুব চাপের মুখে ছিল তখন তারা যথেষ্ট সহিষ্ণুতা ও ধৈর্য দেখিয়েছেন এবং তারা কোনো হত্যা অপরাধের মামলা এ চারজনের বিরুদ্ধে ঠুকে দেননি। ক্রসফায়ারে নিহত কোনো ব্যক্তির লাশকে পুলিশ ইউনিফর্ম পরিয়ে তারা অভিযোগ করতে পারতেন অফিসের ভেতর থেকে মাহমুদ গং গুলি করেছিলেন। যাই হোক, ’হাসমত আলীর দায়ের করা’ প্রতারণা মামলায় জামিন মঞ্জুর হলেও পুলিশের দায়ের করা মামলায় মাহমুদুর রহমান এখনো জেলেই আছেন। সর্বশেষ সংবাদে জানা গেছে, মাহমুদুর রহমানকে জেলে ডিভিশন না দিয়ে নির্জন ঘরে স্থানান্তর করা হয়েছে বা সলিটারি কনফাইনমেন্টে রাখা হয়েছে।

বলা যেতে পারে, রাজনৈতিক হয়রানি ও নির্যাতনের ক্ষেত্রে মাহমুদুর রহমান পৌছে গেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেভেলে। ১ জুনের প্রেস কনফারেন্সে মাহমুদুর রহমান বলেছিলেন, ওয়ান-ইলেভেনের পরে দুটি সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোর করে স্বাক্ষরও আদায় করা অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে তখন শেখ হাসিনাকে যেমন গ্রেফতার করেছিল ঠিক তেমনটিই এখনো হতে চলেছে। তবে ওই সময়ে মাহমুদুর রহমান জানতেন না তাকেও শেখ হাসিনার মতোই নির্জন কারাবাসে রাখা হবে। তফাৎ এই যে, শেখ হাসিনা ছিলেন নির্জন সাবজেলে বা একটি নির্জন বাড়িতে। আর মাহমুদুর রহমান আছেন জেলের একটি নির্জন ঘরে।

আমেরিকান রাষ্ট্রদূত কি বলেছেন?
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সংক্ষিপ্তভাবে জানিয়েছেন আমেরিকান রাষ্ট্রদূতকে কি বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তিনি বলেননি আমেরিকান রাষ্ট্রদূত কি বলেছেন প্রধানমন্ত্রীকে। আমেরিকার শীর্ষ পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং অন্যান্য সাংবাদিক ও মানব অধিকার সংস্থাগুলোর দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানা গেছে। তারা মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতার ও আমার দেশ বনেধর বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছে। ধারণা করা যেতে পারে, আমেরিকান রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টি একই ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রতিবিম্বিত করেছেন শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে। এক্ষেত্রে দুটি ফ্যাক্টর বিবেচনা করতে হয়েছে এবং হচ্ছে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতকে।

এক. তার নিজের দেশে পত্রিকা এবং সাংবাদিক ও মানব অধিকার সংস্থাগুলো এ ঘটনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। দুই. মাহমুদুর রহমানের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল আমেরিকান সরকার অনুসৃত কয়েকটি নীতির বিরোধিতা। সুতরাং এখন মাহমুদুর রহমানের মুক্তির পক্ষে অবস্থান না নিলে এটা মনে হতে পারে যে, আমেরিকান সরকার প্রতিশোধপরায়ণ এবং তাই তারা আওয়ামী সরকারের আমার দেশ দমনপীড়ন নীতির প্রতি সমর্থন দিচ্ছে।
মাহমুদুর রহমানের মুক্তি ও আমার দেশ পুনঃপ্রকাশের পক্ষে যদি রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি অবস্থান নিয়ে থাকেন তাহলে তিনি অবশ্যই ধন্যবাদ পাবেন। তাকে মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে যে, বাংলাদেশে রিমান্ড এখন অমানবিক টর্চারের সমার্থক হয়ে দাড়িয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক খবর ঃ
গতকাল বিডিআর জওয়ান মাহমুদুল হাসান ও আল মুরাদকে কারাগার থেকে হাজির করে রিমান্ডে নেয়ার আবেদন করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আদালত মাহমুদুলকে সাত দিন ও মুরাদকে তিন দিন রিমান্ডে নেয়ার পরেই মাহমুদুল বুকে হাত দিয়ে কাঠগড়ায় পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারান। আদালত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার নির্দেশ দেন।

মাহমুদুল হাসান এবং মাহমুদুর রহমানের মধ্যে তফাৎ আছে। অনেকেই বিশ্বাস করবেন, রিমান্ডে নেয়ার আদেশ হলেও মাহমুদুর রহমান জ্ঞান হারাবেন না।

বাস্তবতাভিত্তিক ধারণা বনাম আইন
কারণ ইতিমধ্যেই মাহমুদুর রহমান বহুবার সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিকবার বেসরকারি হামলা এবং সরকারি হামলা ও মামলা হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি অকুতোভয়ে লড়েছেন।

বেসরকারি হামলা নাম্বার এক হয় বনানীতে নেভাল হেড কোয়ার্টার্সের সামনে। সেখানে দিনের বেলায় মোটর সাইকেলে দুই অজ্ঞাত হামলাকারী তার গাড়িতে ঢিল ছোড়ে। মাহমুদুর রহমান গাড়ি ঘুরিয়ে তাদের ফলো করেন। তারা পালিয়ে যায়। দুই. তেজগাওয়ে সাত রাস্তার মোড়ে সনধ্যাবেলায় তার চলমান গাড়ির ওপর ভারী হাতুড়ি ছোড়া হয়। অজ্ঞাত হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। এরপর লন্ডনে একটি জনসমাবেশে জনৈক হামলাকারী ছুরি হাতে তাকে আক্রমণ করে এবং মাহমুদুর রহমানের স্যুট ছিড়ে যায়।

সরকারি হামলা ও মামলার মধ্যে রয়েছে ঢাকা এয়াপোর্টে দুইবার মাহমুদুর রহমানকে বিদেশ যেতে বাধা দেয়া হয়। এরপর আদালতের নির্দেশ পেয়ে তিনি বিদেশে যেতে পারেন। কিন্তু বিদেশে তার ব্যবসায়িক এপয়েন্টমেন্টগুলো তিনি মিস করেন এবং এর ফলে তার ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়। সর্বোপরি, উল্লেখিত সর্বশেষ দুটি মামলাসহ মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে সরকার মোট ৩১টি মামলা দায়ের করেছে।
সুতরাং এখন প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এবং আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যতই আইনের কথা বলুন না কেন, পাবলিক পারসেপশন (হপড়ধপহয়মসষ) হয়েছে মাহমুদুর রহমানকে ব্যক্তিগতভাবে দমনপীড়ন এবং আমার দেশ পত্রিকা বনধ করার লক্ষ্যে সরকার সর্বশেষ মামলা দুটি দায়ের করেছে বা করিয়েছে।

তাই যারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় এবং লেখকের অধিকারে বিশ্বাস করেন এবং যার মধ্যে নিশ্চয়ই আমেরিকান রাষ্ট্রদূতও আছেন, তাদের সবার আশু কর্তব্য হবে মাহমুদুর রহমানকে যেন রিমান্ডে না নেয়া হয় অন্তত সে বিষয়টি নিশ্চিত করা।

ফাস্ট না স্লো পয়জনিং?
গত বছরের মে মাসে লন্ডনে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তিনি ক্রাচে ভর দিয়ে হাটতেন এবং ডান হাতের আঙ্গুলের এক্সারসাইজ করতেন। যদিও তিনি বলতে চাননি ওয়ান-ইলেভেনের পর আটক অবস্থায় তার ওপর কি টর্চার হয়েছিল তবুও আমি বিভিন্নভাবে জানতে পেরেছিলাম ঘটনার কিছু অংশ। আমি শুধু বলতে চাই কোনো মানুষকেই, তা তিনি যে দল বা মতেরই হোন না কেন, আটক অবস্থায় তারেক রহমানের মতো নির্যাতনের শিকার যেন না হতে হয়। একইভাবে আমি বলতে চাই, কোনো মানুষকেই যেন শেখ হাসিনার মতো সাবজেলে আটক অবস্থায় স্লো পয়জনিংয়ের শিকার যেন না হতে হয়।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন সাবজেলে আটক অবস্থায় তাকে স্লো পয়জনিংয়ের চেষ্টা করা হয়েছিল। তার এ কথার সমর্থন আওয়ামী লীগের কিছু নেতা ও আওয়ামী লীগ সমর্থক ডাক্তারও করেছেন। শেখ হাসিনা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দী ছিলেন। তাই তাকে হয়তো ফাস্ট পয়জনিং নয়- স্লো পয়জনিংয়ের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু মাহমুদুর রহমান, যার জীবননাশের চেষ্টা ইতিমধ্যে করা হয়েছে, তিনি যদি নির্দিষ্ট ও সীমিত সময়ের জন্য রিমান্ডে থাকেন তাহলে অতি উৎসাহী সরকারি কর্মকর্তারা স্লো নয়, ফাস্ট পয়জনিংয়ের দিকে আগ্রহী হতে পারেন। আমি আশা করবো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কড়া নজর রাখবেন এবং মাহমুদুর রহমানের শারীরিক নিরাপত্তা একশ শতাংশ নিশ্চিত করবেন।

সরকারের আক্রোশের কারণ
মাহমুদুর রহমান এবং আমার দেশ-এর বিরুদ্ধে সরকারের আক্রোশের প্রধান পাচটি কারণ হলো-

এক. দৈনিক পত্রিকাটি তথ্যনির্ভর সমালোচনা করেছে এবং দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির গভীর অবনতির বিষয়ে নিয়মিত রিপোর্ট ছেপেছে। দুই. দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে স্ট্যাটিসটিক্স নির্ভর রিপোর্ট ছেপেছে। তিন. শেখ হাসিনার আমেরিকা প্রবাসী ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে আমেরিকান তেল কম্পানি শেভরনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং সেখানে বড় দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে রিপোর্ট ছেপেছে। চার. শেখ হাসিনার বেয়াই ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের পৈতৃক পরিবারের সঙ্গে রাজাকারদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে রিপোর্ট এবং ফটো ছেপেছে। পাচ. আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলামের পৈত্রিক পরিবারের সঙ্গে হেকিমি তথা ইসলামী ব্যবসায়ের সম্পৃক্তার রিপোর্ট ছেপেছে। গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো এসব রিপোর্টের ওপরে ছিল মাহমুদুর রহমানের লেখা নিজস্ব রাজনৈতিক কলাম।

ফলপ্রসূ কলাম
মাহমুদুর রহমানের লেখা যে ফলপ্রসূ হতে পারে সেটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বোঝেন। ওয়ান-ইলেভেনের পরে যে অতি অল্প কয়েকজন লেখক নিয়মিতভাবে সেনা শাসনের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রের পক্ষে এবং মাইনাস টু থিওরির বিরুদ্ধে অর্থাৎ শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মুক্তির পক্ষে লিখেছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন মাহমুদুর রহমান। অকাট্য যুক্তি এবং কোরান শরিফের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি লিখেছিলেন সপ্তাহের পর সপ্তাহ। আজ যে শেখ হাসিনা একজন মুক্ত মানুষ তার পেছনে মাহমুদুর রহমানের অবদান আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই একজন অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি রূপে প্রতিভাত হতে চাইবেন না। বরং তিনি তার ঋণ পরিশোধ করতে চাইলে মাহমুদুর রহমানের মুক্তির ও আমার দেশ-এর পুনঃপ্রকাশের নির্দেশ দিতে পারেন।

ভিন্ন সময়
কিন্তু সেই রকম নির্দেশ যদি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে না আসে তাহলে কি হতে পারে? কেউ কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগ আবার ৭৪-৭৫-এর বাকশালি সময়ে ফিরে যেতে চাইছে। সুতরাং মাহমুদুর রহমান মুক্তি পাবেন না এবং আমার দেশ পুনঃপ্রকাশিত হবে না।

এক্ষেত্রে বর্তমান সরকার যদি বিবেচনা করেন সময়টা বদলে গিয়েছে তাহলে সবারই মঙ্গল হবে।

১৯৭৪-৭৫-এ বাংলাদেশের মিডিয়ার বয়স ছিল খুবই কম। সেই সময়ে জনসাধারণ পাচটি দৈনিক পত্রিকা পড়তো- ইত্তেফাক, সংবাদ, বাংলাদেশ অবজার্ভার, দৈনিক বাংলা ও বাংলাদেশ টাইমস। শেষোক্ত দুটি পত্রিকা ছিল সরকারি মালিকানাধীন। ১৬ জুন ১৯৭৫-এ ইত্তেফাক ও বাংলাদেশ অবজার্ভারকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে এনে দৈনিক সংবাদসহ দেশের বাদবাকি সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু তখন দৈনিক পত্রিকার সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল কম। এখন টেলিকমিউনিকেশন্সে মালটি-ন্যাশনাল কম্পানি থেকে শুরু করে দেশীয় খাদ্য ও পানীয় এবং প্লাস্টিক সামগ্রী প্রস্তুতকারকরা তাদের পণ্য প্রসারের এবং ল্যান্ড ডেভেলপাররা ফ্ল্যাট বিক্রির জন্য নির্ভর করেন দৈনিক পত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ওপর। দ্বিতীয়ত, তখন মিডিয়াতে কর্মী সংখ্যা ছিল কম। এখন অনেক বেশি। আমার দেশ পত্রিকার সাবেক ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আতাউস সামাদ ইতিমধ্যে এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বলেছেন, পত্রিকাটি নিষিদ্ধ করার ফলে তিন শতাধিক কর্মচারী বেকার হয়ে যাবে। তৃতীয়ত, তখন পত্রিকার স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ব নজরদারি প্রায় ছিল না বললেই চলে। এখন স্যাটেলাইট সংযোগের ফলে এবং বিশ্ব জুড়ে সিপিজে, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স, এএইচআরসি জাতীয় বিভিন্ন সংস্থার সদা তৎপরতার ফলে সম্পাদক নির্যাতন ও পত্রিকার স্বাধীনতা হরণ তাৎক্ষণিকভাবে জানাজানি হয়ে যায়। বিশ্ব জনমত সরকারের বিরুদ্ধে চলে যায়। সেটাই হয়েছে গত কয়েক দিনে। আওয়ামী লীগ সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা এবার দ্রুত নষ্ট হয়েছে এই কারণে যে, ক্ষমতাসীন হবার পর চ্যানেল ওয়ান টিভি এবং ফেইসবুক বনধ করে দেয়া হয়েছে।

কিছু আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে থাকেন যে, গত জোট সরকারের আমলে অন্যায়ভাবে ইটিভিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এ কথা সম্পূর্ণ সত্য নয়। ইটিভির বিরুদ্ধে জোট সরকার কোনো মামলা করেনি। আওয়ামী লীগ সরকারেরই আমলে মামলাটি করেছিলেন পাবলিক ইন্টারেস্টে বা জনস্বার্থে কিছু ব্যক্তি। তাদের যুক্তি ছিল আওয়ামী লীগ সরকার ইটিভিকে টেরেস্টৃয়াল সম্প্রচারের সুবিধা দিয়েছে অবৈধভাবে। আদালতের রায় এই যুক্তি মেনে নিয়েছিল। ইটিভি যদি টেরেস্টৃয়াল সম্প্রচারের একক সুবিধা ভোগ করতো তাহলে শুধু বিটিভি-ই নয়, এখনকার সব স্যাটেলাইট নির্ভর প্রাইভেট চ্যানেল খুবই অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতো। সুতরাং ইটিভি নিষিদ্ধকরণ প্রসঙ্গটি অবান্তর। ইটিভি এখন অন্য সব প্রাইভেট চ্যানেলের মতোই শুধু স্যাটেলাইটে সম্প্রচার করছে এবং বিটিভি তার দ্বিতীয় টেরেস্টৃয়াল চ্যানেলে বিটিভি ওয়ার্ল্ড নামে অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ দূরীভূত হয়েছিল জোট সরকারের আমলে আদালত ঘোষিত রায়ে।

লেখা বনাম লেখা
সাপ্তাহিক যায়যায়দিন যখন ১৯৮৫ ও ১৯৮৬-তে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল এবং আমাকে প্রায় ছয় বছর নির্বাসিত থাকতে হয়েছিল তখন আমি একটি বিষয় বুঝতে পারতাম না। তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহমমদ এরশাদ, যিনি নিজেকে একজন কবি ও লেখক রূপে দাবি করতেন, কেন তিনি আমার লেখার উত্তর তার লেখাতে দিচ্ছেন না। তার শাসন আমলে অন্ততপক্ষে বারো জন সম্পাদক তার কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়েছিলেন। তাদের কেউ মন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন। অন্ততপক্ষে সেইসব অনুগত সম্পাদকদের কেউ অথবা অনুগৃহীত লেখক ও সাংবাদিকদের মধ্যে কেউ, আমার লেখার উত্তর লেখায় দিতে পারতেন। সেটা না করে আমার পত্রিকা বনধ করে দিয়ে আমাকে কেন নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল সেই প্রশ্নের উত্তর আমি পাইনি।

আজ প্রায় পচিশ বছর পরে সেই একই পথে আওয়ামী লীগ সরকার এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ, পচিশ বছর আগের তুলনায় এখন সরকার অনুগৃহীত ও উপকৃত সম্পাদক, লেখক, দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার সংখ্যা অনেক অনেক বেশি এবং তার ওপরে চলছে সরকার সমর্থক বিভিন্ন টিভি চ্যানেল।
এদের মধ্যে কেউই পারলেন না বা পারছেন না মাহমুদুর রহমানের লেখার উত্তর লেখায় দিতে? তার কথার উত্তর কথায় দিতে?
আশ্চর্য!

খরচের খাতায় ও টার্নিং পয়েন্ট
আমেরিকার বাকপটু টিভি একজিকিউটিভ রিচার্ড বি সালান্ট এস্কোয়ার ম্যাগাজিনে দেয়া ইন্টারভিউতে বলেছিলেন,
Government plans and programmes, even government leaders are expendable. A free press and the truth can never be.
অর্থাৎ, সরকারি প্ল্যান ও কর্মসূচিগুলোকে, এমনকি সরকারের নেতাদের, খরচের খাতায় রাখা যেতে পারে। কিন্তু একটি স্বাধীন সংবাদ মিডিয়া এবং সত্যকে কখনোই খরচের খাতায় রাখা সম্ভব নয়।

রিচার্ড সালান্টের এই উক্তি বারবার সত্য প্রমাণিত হয়েছে বাংলাদেশে। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এ বাকশাল সরকারের পতনের পর দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ, বাংলাদেশ অবজার্ভার প্রভৃতি তাদের স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছিল। ১৯৯০-এ এরশাদ সরকারের পতনের পর যায়যায়দিন পুনঃপ্রকাশিত হতে পেরেছিল।

বলা বাহুল্য, দৈনিক আমার দেশও পুনঃপ্রকাশিত হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের আগে না পরে? ভবিষ্যতেই এর উত্তর পাওয়া যাবে।
তবে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে, ১ জুন ২০১০-এ আমার দেশ-এর ডিক্লারেশন বাতিল হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি পত্রিকার জীবনে একটি টার্নিং পয়েন্টরূপে কাজ করবে। পুনঃপ্রকাশের পরে পত্রিকাটির সার্কুলেশন অনেক বেড়ে যাবে। বিশেষত তখন যদি মাহমুদুর রহমানের ছবি এবং আত্মপ্রচার কম থাকে বা একেবারেই না থাকে। আর সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের জীবনেও টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে তার বন্দিত্ব। বিএনপি নেতাদের অনুরোধে না হলেও, বিএনপি কর্মীদের দাবিতে মাহমুদুর রহমানকে সরাসরি বিএনপি রাজনীতিতে সমমুখ সারিতে যোগ দিতে হতে পারে।
আওয়ামী লীগের জন্য সেটা হবে চরম দুঃসংবাদ। কারণ সুশিক্ষিত ও সুবক্তা, যুক্তি এবং ভক্তি উভয়বাদী, সৎ ও কর্মঠ, সাহসী ও সত্যবাদী মাহমুদুর রহমান তখন আংশিকভাবে হলেও দূর করবেন বিএনপি নেতৃত্বের দুর্বলতা।


৫ জুন, ২০১০ দৈনিক নয়াদিগন্তে প্রকাশিত।

রবিবার, ৩০ মে, ২০১০

স্বাধীনতা

সম্প্রতি আমাদের দেশ যেন এক অদ্ভুৎ উটের পিঠে সওয়ার হয়েছে। দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী দেখে আর কোন ভাবেই একথা বলা যাচ্ছেনা যে দেশ তার সঠিক ট্র্যাকে চলছে। দেশে এত বড় বড় সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটছে, বাংলাদেশের এলিট বাহিনি RAB বা পুলিশ তার কোন হদিস করতে পারছেনা; অথচ ফেইসবুকে কে কোন নেত্রীর ব্যাঙ্গাত্মক ছবি প্রকাশ করেছে তাকে ধরে ফেলেছে আমাদের দেশের এই এলিট বাহিনি। তার চেয়েও বিস্ময়কর ঘটনা হচ্ছে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) -কে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক ছবি আঁকার প্রতিযোগিতার মত ন্যাক্কারজনন ঘটনা ঘটলেও তা’ নিয়ে মাথাব্যাথা হয়নি এদেশের নেতা-নেত্রীদের, বন্ধ হয়নি ফেইসবুক। কিন্তু নেত্রীদের নিয়ে কার্টুন প্রকাশ করার সামান্য তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে বন্ধ হয়ে গেলো বিশ্বের বৃহত্তম যোগাযোগের সাইট ফেইসবুক। সত্যিই সেলুকাস!বিচিত্র এই দেশ! এখানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) থেকেও বড় হয়ে গেলো আমাদের এই নেতা-নেত্রীরা।

ঘটনা শুধু এখানেই শেষ নয়। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর কার্টুন প্রকাশের ঘটনাকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বলে অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করছে কিছু তরুণ জ্ঞানপাপী। বিষয়টা একটু খোলাসা করা যাক। এই তরুণ জ্ঞানপাপীদের মতে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবারই আছে। তাই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নিয়ে ব্যাঙ্গচিত্র প্রকাশ কোন অন্যায় নয়। আর এর জন্য ফেইসবুক বন্ধ করে দেওয়ারও কোন দরকার নেই। মনে হচ্ছে স্বাধীনতা নতুন করে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে এই নব্য জ্ঞানপাপীদের হাতে। এখানে ন্যায় অন্যায়ের কোন বাছ-বিচার নেই। নেই কোন পাপ-পূন্যের হিসাব। নেই কোন হিতাহিত জ্ঞান। ব্যাক্তি স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে যা ইচ্ছা তাই করা যেতে পারে।

তাহলে তো একথাও বলতে হয়ঃ চুরি করা বা খুন করা সেই চোর বা খুনির পেশার স্বাধীনতা। কেউ যদি খুন করে তাহলে তাকে আর খুনী বা অপরাধী বলা যাবেনা, কারণ সে যা করেছে তা করেছে তার স্বাধীনতা থেকে। যেহেতু সবাই স্বাধীন, সেহেতু চোর বা খুনিকে কিছু বললে তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়ে যেতে পারে। স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার ভয় থেকে যে যাই করুক না কেন তাকে কিছু বলা যাবে না; সে যত বড় অপরাধই করুক না কেন। সর্বোপরি, অত্যাচারীর অত্যাচার, ধর্ষকের ধর্ষন, জালিয়াতির জালিয়াত, লুন্ঠনকারীর লুন্ঠন এবং এহেন যে কোন অপরাধের অপরাধীকে তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার ভয়ে কিছু বলা যাবেনা বা শাস্তি প্রদান করা যাবেনা কারণ এগুলো তার পেশার বা কাজের স্বাধীনতা।

এইভাবে যদি স্বাধীনতা নতুন করে সংজ্ঞায়িত হতে থাকে, তাহলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো নীতি-নৈতিকতা ভুলে যেতে পারে, পরিণত হতে পারে হিতাহিত জ্ঞানশুন্য বর্বর জাতিতে। তাতে কি? স্বাধীনতায় তো আর হস্তক্ষেপ করা হলোনা!

এমতাবস্থায় যে প্রশ্নটি না এসে পারেনা তা’ হলোঃ ফ্রান্সের বা বেলজিয়ামের মুসলিম মেয়েদের হিজাব পরিধান করে স্কুলে যাওয়া কি তাদের স্বাধীনতা নয়? অথচ সেইসব মুসলিম মেয়েদের হিজাব পরিধান করার অধিকা কেড়ে নেওয়া হলেও ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ নামধারী আমেরিকা ভিত্তিক একটি সংগঠনের কাছে এই বেলাতে ‘স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ’ নামক কোন ঘটনা ঘটেনি। তাই এক্ষেত্রে তাদের কোন বিবৃতিও নেই। বিস্ময়কর সত্য হলো, এই সংগঠনটির কাছে ফেইসবুকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নিয়ে কার্টুন প্রকাশে বাধা দিলেই তা হয়ে যায় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। হিজাব পরতে বাধা দেওয়া স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর কার্টুন আঁকতে বাধা দেওয়া স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ! দুমুখো নীতি আর কাকে বলে!

স্বাধীনতা একটি জন্মগত অধিকার। সেই স্বাধীনতা সত্য প্রকাশের বেলায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সেই স্বাধীনতা সৎ পথে চলে জীবন যাপন করার স্বাধীনতা, সেই স্বাধীনতা সৎ পথে উপার্জন করার স্বাধীনতা, সেই স্বাধীনতা সৎ নেতা নির্বাচনের স্বাধীনতা, সেই স্বাধীনতা যুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বাধীনতা। আর এর জন্য যদি হাজার বছরের পুরণো ঐতিহ্যকেও আঘাত করতে হয়, যদি চিরাচরিত ধর্মবিশ্বাসকেও দূরে ঠেলে দিতে হয়, তা করতে কুন্ঠিত না হওয়াই প্রকৃত স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতার নামে হিংসাপরায়ণ হয়ে কোন বিশ্বাসকে যুক্তিহীনভাবে আঘাত করা কেবল মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধেরই নামান্তর।

[কি জানি, এই পোস্টের কারণে আমার এই ব্লগসাইটটিও বন্ধ হয়ে যায় কিনা?]