|| বাংলার নবাবের ওয়েবসাইটে স্বাগতম ||
আমি রুষে উঠে যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া | ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া।
আমার দেশ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আমার দেশ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১৬ আগস্ট, ২০২১

ডেস্কটপে তো ওপেন আছেই, তাহলে ফোনে আবার কেন?

দাস ভঙ্গিতে ডেস্কটপে ফেসবুকের হোমপেজ স্ক্রল করছে রুমিন। হঠাৎ পাশে রাখা ফোনটা বেজে উঠতেই হাতে নিয়ে কথা বলা শুরু করলো। কিছুক্ষণ কথা বলা শেষে আবারও ফেসবুকের হোমপেজে নজর দিলো সে। ফেসবুক ঈদানিং এ্যাড -এর আখড়া। কোনটা যে ফ্রেন্ডদের পোষ্ট আর কোনটা যে স্পন্সর্ড পেজের পোষ্ট বোঝা যায়না। এসব ভাবতে ভাবতে স্ক্রলিং চালিয়ে যায় রুমিন।

রবিবার, ২৬ মার্চ, ২০১৭

২৬শে মার্চ, তোমায় মনে পড়ে!

মেজর জিয়া যখন উই রিভোল্ট বলে কমান্ডিং অফিসারকে হত্যা করে বিদ্রোহী প্রায় ৩০০ সৈন্য নিয়ে রাতের আধারে কালুর ঘাটের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন তখন তিনি তার বাসার পাশ দিয়েই যাচ্ছিলেন, সহযোদ্ধাদের কেউ কেউ তখন তাকে উপদেশ দিচ্ছিল, বাসায় গিয়ে ভাবী (খালেদা জিয়া) বাচ্চা (তারেক, কোকো) দের এক নজর দেখে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিতে অথবা নিরাপদ কোন আশ্রয়ের ব্যাবস্থা করে দিতে।

জবাবে মেজর জিয়া বলছিলেন, "আমার সাথে কত জন সৈন্য আছে?"

সহকর্মী বললেন, "৩০০ র মত"

জিয়া তার দিকে নির্মিমেষ তাকিয়ে থেকে উত্তর দিলেন, "আজ যদি আমি আমার পরিবারের থেকে বিদায় নিতে যাই অথবা তাদের কে নিরাপদ আশ্রয়ে যাবার ব্যাবস্থা করে দেই আমার ৩০০ যোদ্ধার পরিবারের কি হবে?"

শনিবার, ৪ মার্চ, ২০১৭

স্বভাব-সুলভ হাস্যরসে ডিগ্রিপ্রাপ্তদের

যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি সেই শিক্ষায়তনের আচার্য হিসেবে সমাবর্তন পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিজের স্বভাব-সুলভ হাস্যরসে ডিগ্রিপ্রাপ্তদের শোনালেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ৫০তম সমাবর্তনে লিখিত বক্তব্যের বাইরে গিয়ে কথা বলেন পদাধিকারবলে বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য আবদুল হামিদ।
তিনি বলেন, “আমি লিখিত বক্তব্যের বাইরে কিছু বলতে চাই (পুরো সমাবর্তনস্থলে হর্ষধ্বনি)। নিজের কাছেই অবাক লাগে, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। আমি ম্যাট্রিক থার্ড ডিভিশন। আইএ পাশ করছি এক সাবজেক্ট... লজিকে রেফার্ড।
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন আসলাম ভর্তি হওয়ার জন্য...তখন ভর্তি তো দূরের কথা, ভর্তির ফরমটাও আমাকে দেয় নাই। বন্ধু-বান্ধব অনেকে ভর্তি হইলো, ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে তখন আমি যুক্ত। ভর্তি যখন হইতে পারলাম না, তখন দয়ালগুরুর কৃপায় গুরুদয়াল কলেজে (কিশোরগঞ্জে) ভর্তির সুযোগ পেয়ে গেলাম (সমাবর্তনস্থলে হাসির রোল পড়ে)।”

বৃহস্পতিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৭

রঙ্গিলা বারই রে

মৎকার একটা গান।
যেমন চমৎকার তার কথা, তেমনই চমৎকার তার সুর। আর গায়কের চমৎকার গায়কীতে গানটি আরও চমৎকার হয়ে উঠেছে।


বৃহস্পতিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৬

কেমন করে ব্যবহার করবেন ৯৯৯ জরুরি সেবা?

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে পরীক্ষামূলক ভাবে চালু করা হয়েছে ৯৯৯ জরুরি সেবা। যে কোন মোবাইল নম্বর থেকে সম্পূর্ণ টোল ফ্রি কল করে বাংলাদেশের নাগরিকরা জরুরি মুহুর্তে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ বা এ্যাম্বুলেন্স সেবা পাবেন। ৯৯৯ সার্ভিসের প্রশিক্ষিত এজেন্টরা জরুরি মুহুর্তে আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ বা এ্যাম্বুলেন্স সেবা প্রদানকারীর সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। কিভাবে এই সেবাটি ব্যবহার করতে হবে, নিচে তার বিস্তারিত জানানো হল। 

বিভিন্ন ধরণের কল ও জরুরি সেবা প্রদানের জন্য ন্যাশনাল হেল্পডেস্ক-৯৯৯ এর অপারেটরদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। সঠিক ও মান সম্মত সেবা প্রদানের জন্য এই সকল এজেন্টরা কিছু প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়ে থাকেন। তবুও যখন কোন নাগরিক ৯৯৯ এ কল করবেন তখন নিম্নোক্ত বিষয়গুলো খেয়াল রাখা বাঞ্ছনীয়:

১. ঠিকানা প্রদানঃ জরুরি সেবা পাওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য হল সাহায্য প্রার্থীর লোকেশন বা ঠিকানা জানা। অপারেটকে (এজেন্ট) যতটা সম্ভব আপনার সঠিক অবস্থান বলুন, এক্ষেত্রে জেলা বা উপজেলার নামও বলতে হবে । আপনার সঠিক অবস্থান জানা না থাকলে পার্শ্ববর্তী বড় রাস্তা, বাজার বা হাইওয়ের নাম উল্লেখ করতে পারেন। 

শুক্রবার, ১৩ মে, ২০১৬

আসুন, অংক কষি!

বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট অফিস ১০টা। এই ১০টা অফিসে এ্যাভারেজে ২০০ জন করে কর্মকর্তা/কর্মচারী থাকলেও মোট কর্মকর্তা/কর্মচারীর সংখ্যা ১০*২০০=২০০০ জন।

২০১০ থেকে ২০১৫ এই ০৬ বছরে অর্থাৎ (৬*১২=) ৭২ মাসে মাত্র ২০০০ জন কর্মকর্তা/কর্মচারী (সৎ লোক অবশ্যই আছেন) বিভিন্ন ধরণের ইউটিলিটি বিলে এত্ত বেশি গোঁজামিল দিয়েছেন যে তার পরিমাণ ১২০০০ হাজার কোটি টাকা! ক্যান ইউ ইমাজিন? '১২০০০ কোটি টাকা' মানে হলো কয়েকদিন আগে যে ৮০০ কোটি টাকা লুটপাট হলো, তার সঙ্গে ২০০ কোটি টাকা যোগ করলে হয় (৮০০+২০০=) ১০০০ কোটি টাকা; আর সেই ১০০০ কোটি টাকার ১২ গুন করলে হয় ১২০০০ হাজার কোটি টাকা। ক্যামনে বুঝাই হাউ হিউজ দিস এ্যামাউন্ট ইজ!

শুক্রবার, ১১ মার্চ, ২০১৬

হ্যাকিং ! নাকি চুরি ?

বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা চুরি হয়েছে। বাংকের কর্তারা বলছে- চুরি নয় -হ্যাক। আশ্চর্য ! তারা হ্যাক ও চুরির তফাৎ বুঝবে না, এ কেমন কথা।?

কত টাকা?

৮০০ কোটি !

৮ কোটি না, ৮০ কোটি না-আট'শ ! ৯৯ কোটি, ৫০০ কোটি, ৭০০ কোটি-তারপরে-৮০০ কোটি !
ক্যামনে যে বুঝাই ৮০০ কোটি টাকা কত বিশাল !

১ কোটি = ২৩ কেজি। সুতরাং- ২৩ x ৮০০= ১৮ হাজার ৪'শ কেজি ÷ ৪০ কেজি বা ১ মন = ৪৬০ মন !

কীভাবে যে বুঝাই ৮০০ কোটি কতো বিশাল অংক ! আচ্ছা বাদ দেন। ভাবতেই কলিজা ছ্যাৎ করে উঠে।

কোথা থেকে টাকা চুরি হয়েছে?
ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক থেকে।

এর দায় কার? ক্ষতিপূরণ কে দিবে?
অবশ্যই ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক দিবে। আমেরিকার বাপের টাকা না - আমাদের টাকা।

কিন্তু তারা দিবে না। আশ্চর্য !

অর্থমন্ত্রী আবুল মালে মামলা করার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। তবুও দিবেনা। আবারও আশ্চর্য !
 

রবিবার, ১২ জুলাই, ২০১৫

আমরা আদৌ আর মানুষ আছি কিনা(!)

আমরা আদৌ আর মানুষ আছি কিনা তা বলার দরকার নেই; বলা দরকার আমরা পশুত্বের লেভেলকেও ছাড়িয়ে গিয়েছি কিনা?

শিশুটিকে দেখুন তো? সে কত বড় অপরাধ করতে পারে, যে অপরাধের কারণে আপনি তাকে পানি না খেতে দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারেন???


রবিবার, ২১ জুন, ২০১৫

বাংলাদেশের নায়কেরাঃ ড. জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরী

ছবিঋণঃ ম্যাগাসেইসে সাইট
এই মানুষটা বা এই বিষয়টা নিয়ে লিখবোনা ভেবেছিলাম। কারণ কিছু না, আমাকে সব বিষয়ে লিখতে হবে এমন তো নয়!

তবে, আমার নিউজফিডে ঘুরে ফিরে এসেছেন তিনি। সত্যি বলতে কি ‘উনি গনস্বাস্থ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা’, আমি কেবল এইটুকুই জানতাম!

বলছি ড. জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরীর কথা।

১৯৬৪ সালে এম্‌বিবিএস পাস করার পর পোস্ট-গ্র্যাড অর্জনের জন্য ইউকে গমন করেন। ৭১-এ যখন বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়, তিনি লন্ডনে ‘সার্জিক্যাল ট্রেইনিং’ –এ ছিলেন। দেশে ফিরেই যুদ্ধে যোগ দেন এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার্থে একটি ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।  

স্থানীয় গ্রাম্য মানুষজনও সেই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে থাকে। পূর্বের কোন ট্রেইনিং না থাকা গ্রাম্য মহিলাদেরকে অল্পসময়ের মধ্যে ট্রেইনিং প্রদান করে রোগীর শূশ্রুষার ব্যাবস্থা করেন ড. জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরী।

সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৫

ধর্ষনের দায় মূলত ধর্ষকের পাশবিকতার উপরেই বর্তায়

নববর্ষে টিএসসিতে নারীদের যৌন হয়রানি নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি দেখছি আমার ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা বন্ধু-বান্ধব, সিনিয়র, জুনিয়র অনেকের মাঝেই।

সমস্যাটা হলো, যুক্তির দুই পিঠেই বহুল সংখ্যক মানুষের সমর্থণ রয়েছে। বিভ্রান্তির বিষয়টি তাহলে কী??? ‘ধর্ষণের পেছনে নারীর অশ্লীল পোষাকই দায়ী কিনা’ নাকি ‘ভিক্টিম নারীকেই কেন দায়ী করা হচ্ছে?’

বিভ্রান্তিটি সৃষ্টি হওয়ার কিছু কারণ রয়েছে বলে আমার মনে হয়। 

তার আগে ঘটনাটি জানা দরকার। বাংলা ১৪২২ এর পহেলা বৈশাখের দিন (ইংরেজি এপ্রিল ১৪, ২০১৫) টিএসসিতে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন কয়েকজন নারী(১)। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্র ইউনিয়ন নেতা লিটন নন্দী প্রথম আলোকে বলেন, বাংলা নতুন বছর উপলক্ষে গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানুষের প্রচণ্ড ভিড় ছিল। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে শাহবাগ থেকে টিএসসি আসার পথে তাঁরা কয়েকজন দেখেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটে ৩০-৩৫ জনের একদল যুবক বেশ কয়েকজন নারীকে যৌন হয়রানি করছে। তারা কারও কারও শাড়ি ধরে টান দিচ্ছিল। কয়েকজনকে তারা বিবস্ত্রও করে ফেলে। এ সময় সেখানে বাধা দিতে গেলে ওই যুবকদের ধাক্কায় তিনি পড়ে যান এবং তাঁর হাত ভেঙে যায়।

ঘটনার পরপরই ফেইসবুক সহ সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনার ঝড় শুরু হয়। তীব্র ঘৃণার পাশাপাশি দোষীদের শনাক্ত করে তড়িৎ পদক্ষেপের আহবান জানান সকলেই। 

মঙ্গলবার, ৮ জুন, ২০১০

আমার দেশ-এর টার্নিং পয়েন্টঃ প্রকাশনা নিষিদ্ধ

আমার দেশ-এর টার্নিং পয়েন্টঃ প্রকাশনা নিষিদ্ধ

শফিক রেহমান

কিছু কাল জুড়ে শোনা যাচ্ছিল বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের কর্মসূচিতে বিদ্যুৎ-গ্যাস এবং পানি নয়- যে দুটি বিষয় অগ্রাধিকার পাচ্ছে তা হলো, এক. ক্যান্টনমেন্টে যে বাড়িতে সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ম্যাডাম খালেদা জিয়া বসবাস করছেন, সেখান থেকে তাকে উৎখাত করা এবং দুই. দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও লেখক মাহমুদুর রহমানকে জেলে নেয়া।

চলমান বিদ্যুৎ-গ্যাস ও পানি সংকটের চাইতেও আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে গভীরতর সংকট হয়েছে খালেদা জিয়ার বাসস্থান এবং মাহমুদুর রহমানের দৈনিক পত্রিকা, এমনটা অনেকেই বিশ্বাস করছিলেন না। একটি বাড়ি এবং একটি পত্রিকা আওয়ামী লীগ সরকারকে এমনই দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে যে, তারা বিদ্যুৎ-গ্যাস ও পানির অভাব, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, কর্মসংস্থানের নিম্নগতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মোকাবিলার বদলে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে শুধু ওই দুটি বিষয় সর্বাগ্রে মোকাবিলার জন্য? এটা বিশ্বাস করতে অনেকের কষ্ট হলেও গত সপ্তাহে মাহমুদুর রহমানকে সত্যিই জেলবন্দী করা, দৈনিক আমার দেশ-এর প্রেস গালাসিল করে দেয়া এবং আমার দেশ পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়েছে। এ সবই ঘটেছে মঙ্গলবার ১ জুন ২০১০-এর বিকেল পাচটা থেকে পরবর্তী ১১ ঘণ্টার মধ্যে।
ওই দিন দুপুর থেকেই মোবাইল ফোন ও এসএমএস-এর রিং টোনের সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছিল একটি সংবাদঃ আজ মাহমুদুর রহমান গ্রেফতার হবেন ও আমার দেশ বন্ধ হয়ে যাবে।

কেউ যদি জানতে চান এই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার খবরটির ভিত্তিটা কি, তাহলে উত্তর আসে আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশক ও মুদ্রাকর মোহাম্মদ হাসমত আলীকে একটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আটকে রেখেছে তাদের অফিসে। তখনই আমার মনে পড়ে গেল ১৯৮৫ এবং ১৯৮৬-তে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন নিষিদ্ধ ঘোষিত হবার পূর্ব সময়গুলো। তফাৎ এই যে, তখন বাংলাদেশে মোবাইল ফোন যুগ ছিল না। ফলে খুব কম সংখ্যক ব্যক্তিই জানতেন সরকার কিভাবে দমনপীড়ন কাজগুলো করবে। সুদীর্ঘ পঁচিশ বছর পরে আবার সেই প্রক্রিয়াটি কিভাবে সম্পন্ন হতে চলেছে সেটা জানার জন্য বিকেল চারটার সময়ে আমি চলে যাই কাওরানবাজারে এয়ারপোর্ট রোডের ইসপাত ভবনের এগারো তলায় আমার দেশ-এর সম্পাদকের অফিসে।

মাহমুদুর রহমানের সাথে একাত্মতা প্রকাশের জন্য কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মাহমুদুর রহমান তাদের বলেন, তিনি খবর পেয়েছেন হাসমত আলীকে একটি গোয়েন্দা সংস্থার অফিসে কয়েক ঘণ্টা আটক রাখার পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তবে ছেড়ে দেয়ার আগে দুটি শাদা কাগজে হাসমত আলীকে সই দিতে হয়েছে।

সাবেক এমপি মোসাদ্দেক আলী ফালুর ভাই আলহাজ্ব মোহাম্মদ হাসমত আলী আমার দেশ পত্রিকার সূচনালগ্ন থেকে প্রকাশক ও মুদ্রাকরের দায়িত্ব পালন করছিলেন। যেসব পাঠক পত্রিকা প্রকাশের আইনগত মারপ্যাচ জানেন না, তাদের এখানে জানিয়ে রাখছি, একটি পত্রিকার টাইটেল বা নামের মালিক হন পত্রিকাটির প্রকাশক ও মুদ্রাকর। এ জন্য প্রকাশের আগে স্থানীয় ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার (ডিসি)-এর মাধ্যমে তাকে আবেদন করতে হয় সরকারের কাছে যে, তিনি একটি পত্রিকা প্রকাশে ইচ্ছুক। এরপর সেই ব্যক্তির বিভিন্ন যোগ্যতা সম্পর্কে পুলিশের সেপশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) তাদের তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করে এবং তাদের রিপোর্ট ডিসি অফিসে পেশ করে। ওই রিপোর্ট যদি ভালো হয় অর্থাৎ সরকারের মনোঃপূত হয় তাহলে নির্ধারিত দিনে আবেদনকারীকে সশরীরে উপস্থিত হতে হয় ডিসি অফিসে। সেখানে ডিসির সামনে তাকে ফর্ম-বি নামে একটি ঘোষণাপত্রে সই করতে হয়। এই ঘোষণাপত্রে লেখা থাকেঃ
আমি, এই মর্মে আরও ঘোষণা করিতেছি যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ অথবা বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থের প্রতিকূলে এমন কোন অপরাধজনক বা আপত্তিকর বিষয় আমার উপরোক্ত পত্রিকায় মুদ্রণ বা প্রকাশে বিরত থাকিব এবং বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত ১৯৭৩ সালের ছাপাখানা ও প্রকাশনা (ডিক্লারেশন ও রেজিস্ট্রেশন) আইনের নিয়মাবলী মানিয়া চলিতে বাধ্য থাকিব।

এটিকেই বলা হয় ডিক্লারেশন। এই ডিক্লারেশনের পর থেকে আবেদনকারী পত্রিকাটির নামের একক মালিক বা সোল প্রোপ্রাইটর হয়ে যান- তিনি পত্রিকাটি প্রকাশ করুন আর নাই করুন। এই মালিকানার কোনো ভাগাভাগি বা অংশীদারিত্ব সম্ভব নয়।
দৈনিক ইত্তেফাক-এর প্রকাশনা সংকট ছিল এখানেই। দুই ভাইয়ের প্রচণ্ড বিরোধ মীমাংসার লক্ষ্যে ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠানটির সকল সম্পদ ভাগাভাগি করা গেলেও ইত্তেফাক নাম, যা টাইটেল বা ডিক্লারেশনের ভাগাভাগি সম্ভব ছিল না। তাই সম্প্রতি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু দশ কোটি টাকার বিনিময়ে তার বড় ভাই মইনুল হোসেনের কাছ থেকে ইত্তেফাক টাইটেলটি ফেরত নিয়েছেন এবং তিনিই এখন এককভাবে দৈনিক ইত্তেফাকের মালিক।

প্রকাশক ও মুদ্রাকরের পক্ষে যদি কোনো কারণে সেই দায়িত্ব পালন অসম্ভব হয়ে পড়ে তাহলে প্রায় একই পক্রিয়ায় তাকে আবার ডিসির সামনে সশরীরে উপস্থিত হয়ে আরেকটি ঘোষণাপত্রে (ফরম সি) সই দিয়ে তার অপারগতা জানাতে হয়। যদি পত্রিকাটির প্রকাশনা চলমান থাকে তাহলে একই প্রক্রিয়ায় পত্রিকাটির নতুন প্রকাশক ও মুদ্রাকরকে ফরম বি-তে সই করতে হয় এবং তারপর থেকে তিনিই হন নতুন মালিক।

এখানে পাঠকদের জানিয়ে রাখছি, পত্রিকার প্রকাশক ও মুদ্রাকরই নিয়োগ করেন পত্রিকার সম্পাদককে। তবে তার আগে এসবি-র ক্লিয়ারেন্স নিতে হয়। কোনো কারণে যদি সম্পাদক তার পদ ছেড়ে দেন বা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন, তাহলে তিনি একজন নতুন সম্পাদক, অথবা কোনো নতুন সম্পাদককে পাওয়া সম্ভব না হলে একজন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নিয়োগ করে পত্রিকার প্রকাশনা চলমান রাখতে পারেন মালিক। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত প্রকাশক ও মুদ্রাকর নিয়োগ সম্ভব নয়।

আর এখানেই সরকার সমস্যায় ফেলতে চেয়েছে মাহমুদুর রহমানকে। সরকার অভিযোগ করেছে তিনি ডিক্লারেশন সম্পর্কিত আইন মেনে চলেননি এবং তাই আমার দেশ পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়েছে।

আমার দেশ পত্রিকার প্রিন্টার্স লাইনে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রূপে মাহমুদুর রহমানের নাম এবং প্রকাশক ও মুদ্রাকর রূপে আলহাজ্ব মোহাম্মদ হাসমত আলীর নাম ছিল।
মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার, জাপানে সিরামিকসে টেকনিকাল শিক্ষাপ্রাপ্ত মাহমুদুর রহমান মেথডিকাল ব্যক্তি ও সফল ব্যবসায়ী। তিনি সেদিন তার অফিসে আহূত প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে গত প্রায় এক বছরে এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে তার চলমান যোগাযোগের কথা জানান এবং প্রমাণস্বরূপ তিনি বিভিন্ন ডকুমেন্টস দেখান। তার এসব ডকুমেন্টস এবং পরবর্তীতে বিবিসিতে প্রচারিত ডিসির ইন্টারভিউ থেকে নিচের টাইমলাইনটি জানা যায়।

ডিক্লারেশন সমস্যার টাইমলাইন
২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৪ দৈনিক আমার দেশ প্রকাশিত।
আগস্ট ২০০৮ঃ মোসাদ্দেক আলী ফালু জেলে বন্দী এবং আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড গভীর আর্থিক সংকটে নিপতিত। মাহমুদুর রহমান ও তার কিছু পার্টনার এই সংকট মোচন করে প্রকাশনা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেন।
১৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮ ঃ আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড-এর শেয়ার মালিকানা হস্তান্তর সম্পর্কিত দলিল স্বাক্ষরিত হয়।

৬ অক্টোবর ২০০৮ ঃ আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের নতুন চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান কার্যভার গ্রহণ করেন।

১৫ মে ২০০৯ ঃ আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আতাউস সামাদ পদত্যাগ করেন।
২৬ এপ্রিল ২০০৯ ঃ আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড একটি চিঠি দিয়ে ঢাকার ডিসিকে জানিয়ে দেয় বোর্ড অফ ডিরেকটর্সের সিদ্ধান্ত মোকাবেক চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নিযুক্ত হয়েছেন।

১৬ জুন ২০০৯ ঃ ডিসির পক্ষে ঢাকার বিশেষ পুলিশ সুপার আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডকে জানান যে, নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের বিষয়ে ডিসির আপত্তি নেই।

৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ ঃ মুদ্রণালয়ের নিয়ন্ত্রক ও মুদ্রাকরের নাম বদলের জন্য আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড আবেদন করে ডিসির কাছে এবং আইনের বিধান অনুযায়ী এই বদলের বিষয়ে আদালতে ঘোষণাপত্র দেয়। একই সঙ্গে পত্রিকার প্রকাশক বদল করে নতুন প্রকাশকরূপে মাহমুদুর রহমানের দায়িত্ব নেয়ার বিষয়টিও ডিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।

১১ অক্টোবর ২০০৯ ঃ সাবেক প্রকাশক হাসমত আলী ডিসি অফিসে গিয়ে ফর্ম সি-তে সই করে ঘোষণা দেন যে, তিনি প্রকাশকের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন।

৪ নভেম্বর ২০০৯ ঃ ডিপার্টমেন্ট অফ ফিল্মস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স (ডিএফপি বা চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতর) প্রকাশক বিষয়ে অনাপত্তিপত্র দেয়। ডিএফপির ডেপুটি ডিরেক্টর মাসুদা খাতুন স্বাক্ষরিত এই পত্রে বলা হয়, ’আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশক আলহাজ্ব মোহামমদ হাসমত আলীর পরিবর্তে জনাব মাহমুদুর রহমানের নাম প্রতিস্থাপন করার অনুমোদন দেয়া যেতে পারে।’

১৫ মার্চ ২০১০ ঃ ঢাকার ডিসি একটি চিঠিতে আমার দেশ পাবলিকেশন লিমিটেডের কাছে জানতে চান যে, কেন এখনো দৈনিক আমার দেশের প্রিন্টার্স লাইনে প্রকাশকরূপে হাসমত আলীর নাম ছাপা হচ্ছে? উত্তরে আমার দেশ তাদের চিঠিতে জানায় যে, ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯-এর চিঠিতে ডিসিকে মুদ্রণালয়ের নিয়ন্ত্রক-মুদ্রাকর ও প্রকাশক বদল বিষয়ে জানানো হলেও এখনো এ বিষয়ে আপত্তি বা অনাপত্তি জানানো হয়নি। সুতরাং প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা থাকার কারণে এখনো আগের প্রকাশকের নামই প্রিন্টার্স লাইনে ছাপা হচ্ছে। একই সঙ্গে ডিসিকে আমার দেশ পাবলিকেশন লিমিটেড অনুরোধ জানায় খুব দ্রুত তাদের আবেদন নিষ্পত্তি করতে।
১ জুন ২০১০ ঃ সকাল নয়টায় জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসআই) সদস্যরা হাসমত আলীর শাহজাহানপুরের বাসা থেকে তাকে ধরে নিয়ে যান। বেলা দুইটার সময়ে হাসমত আলী দুটি কাগজে সই করার পর পাচ ঘণ্টার বন্দীদশা থেকে মুক্তি পান। হাসমত আলী জানান, এই একটি কাগজ ঢাকার ডিসিকে এবং অপর কাগজটি তেজগাও শিল্পাঞ্চল থানার ওসিকে লেখা। ওই দুটি কাগজে লেখা রয়েছে, ’তিনি (হাসমত আলী) আমার দেশের প্রকাশক নন। তার নাম ছাপা হওয়ায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হোক।’

উল্লেখ্য, তেজগাও শিল্পাঞ্চলে আমার দেশ-এর ছাপাখানা অবস্থিত। কিন্তু সংবাদ সংস্থা বিডি নিউজ জানায় এনএসআইয়ের কর্মকর্তাদের কেউ হাসমত আলীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সত্যতা স্বীকার করেননি।

এ খবর জানার সঙ্গে সঙ্গে মাহমুদুর রহমান কাওরানবাজারে অবস্থিত আমার দেশ-এর কার্যালয়ে চলে আসেন এবং অচিরেই গ্রেফতার হতে পারেন আশঙ্কা করে বিকেল পাচটায় সেখানে প্রেস কনফারেন্স ডেকে সরকারি কার্যক্রমকে পৃএম্পট (হড়প-পশহয়) করেন। অর্থাৎ আগেই তিনি তার পক্ষের বক্তব্য প্রকাশ করে দেন। এই প্রেস কনফারেন্সে একটি প্রশ্নের উত্তরে মাহমুদুর রহমান বলেন, ’সোমবার রাতে (৩১ মে) আমি শুনেছি দশ দিনের মধ্যে আমার দেশ বনধ করে আমাকে অ্যারেস্ট করা হবে। কিন্তু আমি একে গুজব বলে এড়িয়ে যাই। কিন্তু আজ দেখছি সেটা গুজব নয়। সে খবরই সত্য হতে যাচ্ছে।’
রাজধানীতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মাহমুদুর রহমানের আসন্ন গ্রেফতারের সংবাদ। আমার দেশ-এর কার্যালয়ে উপস্থিত হতে থাকেন উদ্বিগ্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মী, আইনজীবী, পেশাজীবী ও সমর্থকবৃন্দ।

রাত এগারোটায় প্রায় ৪০ জন পুলিশের একটি টিম ইসপাত ভবনে আমার দেশ অফিসের সামনে অবস্থান নেয় এবং জোর করে অফিসে ঢোকার চেষ্টা করে। পুলিশের তেজগাও জোনের ডিসি সেইদিন সনধ্যার পর মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলার কপি হাতে নিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার কাছে কোনো গ্রেফতার ওয়ারেন্ট না থাকায় আমার দেশ-এ কর্মরত সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ভেতরে ঢুকতে পুলিশকে বাধা দেন। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা জুড়ে চলে তীব্র বাকবিতণ্ডা এবং মাঝে মধ্যে ধাক্কাধাক্কি। এক পর্যায়ে পুলিশ ভেতরে খাবার ও পানির বোতল নিতে বাধা দেয়। কেটে দেয় অফিসের ডিশ লাইন।

ওদিকে ইসপাত ভবনের সামনে কয়েক শ আমার দেশ সমর্থক সমবেত হয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও স্লোগান দিতে শুরু করেন। পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়।

রাত সাড়ে তিনটায় তেজগাও জোনের ডিসির নেতৃত্বে দাঙ্গা পুলিশের একটি টিম জোর করে আমার দেশ কার্যালয়ে ঢোকে এবং সাংবাদিক ও কর্মীদের ওপর লাঠিচার্জ করে। রাত চারটায় পুলিশ মাহমুদুর রহমানকে গোয়েন্দা পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে চলে যায়।

ওদিকে তেজগাও শিল্পাঞ্চলে আমার দেশ-এর প্রেসে পুলিশ হানা দেয়। সেই মুহূর্তে আমার দেশ-এর ২ জুন ২০১০ সংখ্যার কয়েক হাজার কপি ছাপা হয়ে গিয়েছিল। পুলিশ সেসব কপি বাজেয়াফত করে এবং আমার দেশ প্রেস গালাসিল করে দেয়। উল্লেখ্য, এই একই প্রেসে বিএনপি সমর্থক দৈনিক দিনকালও ছাপা হতো। সরকার পক্ষ থেকে জানানো হয় দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল হয়ে গিয়েছে।

২ জুন ২০১০ ঃ দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা অপ্রকাশিত।
মাহমুদুর রহমানকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেটা জানার জন্য তার পরিবার, সাংবাদিকবৃন্দ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা উদ্বিগ্ন ছিলেন। গুজব ছড়িয়ে পড়ে তাকে ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে ডিজিএফআইয়ের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অসমর্থিত সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে তাকে ক্যান্টনমেন্ট থানার হাজতে রাখা হয়েছে।

এইদিন বিকেল পৌনে পাচটায় মাহমুদুর রহমানকে দুটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কড়া পাহারায় ঢাকার সিএমএম আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়।

মাহমুদুর রহমানের পক্ষে আইনজীবীরা বলেন, মাহমুদুর রহমান একজন সুশিক্ষিত ব্যক্তি। সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা ও একজন তুখোড় সাংবাদিক। ১/১১-এর পর দুই নেত্রীকে দেশ থেকে বিতাড়িত করার প্রচেষ্টা তিনি তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে রুখে দেন। ফলে দেশে গণতন্ত্র রক্ষা পায়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করে সরকার পত্রিকাটি বনধ করে দেয়। ফলে পাচ শতাধিক সাংবাদিক ও কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন। সরকারের বিরুদ্ধে পত্রিকায় লেখার কারণেই পত্রিকা বনেধর ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। পত্রিকার প্রকাশক পরিবর্তন বিষয়ে ২১/৮/১০ তারিখ থেকে বহুবার চেষ্টা করেও সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে তা করা সম্ভব হয়নি। হাসমত আলীকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে তাকে দিয়ে বাধ্য করে এ মামলা করা হয়েছে। এ মামলার ধারা জামিনযোগ্য হওয়ায় সরকার ষড়যন্ত্র করে নাটক সাজিয়ে পরে পুলিশের কর্তব্যকাজে বাধাদানের কথা উল্লেখ করে অন্য মামলায় পাচ দিনের রিমান্ড চায়। তাকে রিমান্ড বাতিল করে জামিন দিলে তিনি পলাতক হবেন না।

জামিনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, মাহমুদুর রহমান আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। পুলিশকে আটক করে মারধর করেছেন। তাকে জামিন না দিয়ে রিমান্ডে দেয়া হোক।

এর মধ্যে পুলিশকে ’মারধর ও কর্তব্য কাজে বাধা দান’ সংক্রান্ত একটি মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত রিমান্ড ও জামিন- উভয় আবেদনই নামঞ্জুর করেন এবং মাহমুদুর রহমানকে তিন দিনের মধ্যে জেল গেইটে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মামলা তদন্তকারীদের নির্দেশ দেন। একই আদালত হাসমত আলীর দায়ের করা প্রকাশনা বিষয়ে প্রতারণার মামলায় বিশ হাজার টাকা মুচলেকায় একজন স্থানীয় আইনজীবীর জিমমায় মাহমুদুর রহমানের জামিন মঞ্জুর করেন।

অর্থাৎ ২ জুন রাত মাহমুদুর রহমানকে জেলে কাটাতে হয়। একটি সূত্র জানিয়েছে তাকে কোনো ডিভিশন দেয়া হয়নি।

এই দিন দেশে ও বিদেশে মাহমুদুর রহমানের অ্যারেস্ট ও আমার দেশ বনধ হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। সংসদে বিএনপির এমপিরা ওয়াক আউট করেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, ’মানিক মিয়ার সাথে মোনায়েম খা-র সরকার যে আচরণ করেছিল, বর্তমান সরকার মাহমুদুর রহমানের সাথে একই আচরণ করেছে। ওয়ান-ইলেভেনের পর যে পরিবর্তন আশা করা হয়েছিল তা আসেনি।’
বিদেশে নিউ ইয়র্ক টাইমসে একটি দীর্ঘ রিপোর্টে এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক মনিটরিং সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স, এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন (সংক্ষেপে এএইচআরসি) এবং কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সংক্ষেপে সিপিজে) এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে।

৩ জুন ২০১০ ঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে তার কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টি দেখা করেন।

মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার ও আমার দেশ-এর প্রকাশনা বনধ বিষয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, পুলিশের আইজি নূর মোহামমদ এবং র্যাবের ডিজি হাসান মাহমুদ খন্দকার।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ শেখ হাসিনার সাথে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎকার বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং দেয়ার সময়ে জানান, রাষ্ট্রদূতকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশের সংবাদ মাধ্যম সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর রুদ্ধদ্বার বৈঠক বিষয়ে কোনো সরকারি বিবৃতি আসেনি। অবশ্য সে আশাও করা হয়নি।

কিন্তু জানা যায়, মাহমুদুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবারও পুলিশ পাচদিনের রিমান্ডের আবেদন করেছে। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে মাহমুদুর রহমানের উপস্থিতিতে ঢাকার মহানগর হাকিম মোহামমদ নজরুল ইসলাম ৭ জুন সোমবার শুনানির জন্য তারিখ ধার্য করেন।

অন্যদিকে মাহমুদুর রহমানকে কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তেজগাও থানার সাব ইন্সপেক্টর ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রেজাউল ইসলাম রেজা দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যান। কারা কর্তৃপক্ষ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাহমুদুর রহমানকে ৭ নম্বর সেল থেকে বের করে কারা প্রশাসনের অফিসের উত্তর পাশের খোলা বারান্দায় নিয়ে যান। জিজ্ঞাসাবাদের সময় কারাগারে একজন ডেপুটি জেলার ছাড়াও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিট থেকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়ে চলে ১টা ১৩ মিনিট পর্যন্ত। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাকে মাহমুদুর রহমান পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, আপনারা আমাকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করেছেন।

কারাগার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানা যায়, মাহমুদুর রহমানের কাছে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রেজাউল ইসলাম তেজগাও থানায় ২/৬/২০১০ তারিখে দায়ের হওয়া ২ নম্বর মামলার নথিপত্র দেখিয়ে জানতে চান, ’আপনার উপস্থিতিতে এ মামলার এজাহারভুক্ত অন্যান্য সাংবাদিক ও অজ্ঞাত কিছু ব্যক্তি সরকারি কাজে বাধা প্রদান করেন।’ মামলায় যাদের নাম রয়েছে ওই সব সাংবাদিকের নাম, পদবি ও ঠিকানা ঠিক আছে কি না তা জানতে চাওয়া হয়।

মাহমুদুর রহমান পুলিশ কর্মকর্তাকে জানান, মামলায় যাদের নাম উল্লেখ রয়েছে তারা সবাই তার পত্রিকার সাংবাদিক। এরপর তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে পুলিশ কর্মকর্তার কাছে জানতে চান, ’আপনারা (পুলিশ বাহিনী) অন্যায়ভাবে অফিসের একতলা থেকে ১৫ তলা পর্যন্ত পুলিশ দিয়ে চারদিক ঘিরে আমাদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। এক পর্যায়ে কোনো কারণ ছাড়াই সাংবাদিক ও কর্মচারীদের মারধর করেন। আবার আমাদের বিরুদ্ধেই আপনারা মামলা দিয়েছেন। মামলা তো আপনাদের বিরুদ্ধে হওয়া উচিত। আমরাই আপনাদের বিরুদ্ধে মামলা করব।’

তখন দারোগা চুপ হয়ে তার ডায়রিতে সংক্ষিপ্ত নোট লিখে কারাগার থেকে বেরিয়ে যান।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছাড়াও আমার দেশ-এর আরো তিনজন সিনিয়র সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা করেছে। এরা হচ্ছেন, সৈয়দ আবদাল আহমেদ (ডেপুটি সম্পাদক), জাহেদ চৌধুরী (সিটি সম্পাদক) ও সঞ্জীব চৌধুরী (সিনিয়র সহকারী সম্পাদক)।

শেখ হাসিনার লেভেলে
কেউ কেউ বলবেন মাহমুদুর রহমান ও আমার দেশ-এর এই তিন সাংবাদিক সৌভাগ্যবান বা লাকী ফোর! কারণ ১ জুন রাতে ওপরের নির্দেশে আমার দেশ পত্রিকা অফিস হামলাকারী পুলিশ যখন খুব চাপের মুখে ছিল তখন তারা যথেষ্ট সহিষ্ণুতা ও ধৈর্য দেখিয়েছেন এবং তারা কোনো হত্যা অপরাধের মামলা এ চারজনের বিরুদ্ধে ঠুকে দেননি। ক্রসফায়ারে নিহত কোনো ব্যক্তির লাশকে পুলিশ ইউনিফর্ম পরিয়ে তারা অভিযোগ করতে পারতেন অফিসের ভেতর থেকে মাহমুদ গং গুলি করেছিলেন। যাই হোক, ’হাসমত আলীর দায়ের করা’ প্রতারণা মামলায় জামিন মঞ্জুর হলেও পুলিশের দায়ের করা মামলায় মাহমুদুর রহমান এখনো জেলেই আছেন। সর্বশেষ সংবাদে জানা গেছে, মাহমুদুর রহমানকে জেলে ডিভিশন না দিয়ে নির্জন ঘরে স্থানান্তর করা হয়েছে বা সলিটারি কনফাইনমেন্টে রাখা হয়েছে।

বলা যেতে পারে, রাজনৈতিক হয়রানি ও নির্যাতনের ক্ষেত্রে মাহমুদুর রহমান পৌছে গেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেভেলে। ১ জুনের প্রেস কনফারেন্সে মাহমুদুর রহমান বলেছিলেন, ওয়ান-ইলেভেনের পরে দুটি সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোর করে স্বাক্ষরও আদায় করা অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে তখন শেখ হাসিনাকে যেমন গ্রেফতার করেছিল ঠিক তেমনটিই এখনো হতে চলেছে। তবে ওই সময়ে মাহমুদুর রহমান জানতেন না তাকেও শেখ হাসিনার মতোই নির্জন কারাবাসে রাখা হবে। তফাৎ এই যে, শেখ হাসিনা ছিলেন নির্জন সাবজেলে বা একটি নির্জন বাড়িতে। আর মাহমুদুর রহমান আছেন জেলের একটি নির্জন ঘরে।

আমেরিকান রাষ্ট্রদূত কি বলেছেন?
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সংক্ষিপ্তভাবে জানিয়েছেন আমেরিকান রাষ্ট্রদূতকে কি বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তিনি বলেননি আমেরিকান রাষ্ট্রদূত কি বলেছেন প্রধানমন্ত্রীকে। আমেরিকার শীর্ষ পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং অন্যান্য সাংবাদিক ও মানব অধিকার সংস্থাগুলোর দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানা গেছে। তারা মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতার ও আমার দেশ বনেধর বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছে। ধারণা করা যেতে পারে, আমেরিকান রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টি একই ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রতিবিম্বিত করেছেন শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে। এক্ষেত্রে দুটি ফ্যাক্টর বিবেচনা করতে হয়েছে এবং হচ্ছে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতকে।

এক. তার নিজের দেশে পত্রিকা এবং সাংবাদিক ও মানব অধিকার সংস্থাগুলো এ ঘটনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। দুই. মাহমুদুর রহমানের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল আমেরিকান সরকার অনুসৃত কয়েকটি নীতির বিরোধিতা। সুতরাং এখন মাহমুদুর রহমানের মুক্তির পক্ষে অবস্থান না নিলে এটা মনে হতে পারে যে, আমেরিকান সরকার প্রতিশোধপরায়ণ এবং তাই তারা আওয়ামী সরকারের আমার দেশ দমনপীড়ন নীতির প্রতি সমর্থন দিচ্ছে।
মাহমুদুর রহমানের মুক্তি ও আমার দেশ পুনঃপ্রকাশের পক্ষে যদি রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি অবস্থান নিয়ে থাকেন তাহলে তিনি অবশ্যই ধন্যবাদ পাবেন। তাকে মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে যে, বাংলাদেশে রিমান্ড এখন অমানবিক টর্চারের সমার্থক হয়ে দাড়িয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক খবর ঃ
গতকাল বিডিআর জওয়ান মাহমুদুল হাসান ও আল মুরাদকে কারাগার থেকে হাজির করে রিমান্ডে নেয়ার আবেদন করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আদালত মাহমুদুলকে সাত দিন ও মুরাদকে তিন দিন রিমান্ডে নেয়ার পরেই মাহমুদুল বুকে হাত দিয়ে কাঠগড়ায় পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারান। আদালত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার নির্দেশ দেন।

মাহমুদুল হাসান এবং মাহমুদুর রহমানের মধ্যে তফাৎ আছে। অনেকেই বিশ্বাস করবেন, রিমান্ডে নেয়ার আদেশ হলেও মাহমুদুর রহমান জ্ঞান হারাবেন না।

বাস্তবতাভিত্তিক ধারণা বনাম আইন
কারণ ইতিমধ্যেই মাহমুদুর রহমান বহুবার সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিকবার বেসরকারি হামলা এবং সরকারি হামলা ও মামলা হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি অকুতোভয়ে লড়েছেন।

বেসরকারি হামলা নাম্বার এক হয় বনানীতে নেভাল হেড কোয়ার্টার্সের সামনে। সেখানে দিনের বেলায় মোটর সাইকেলে দুই অজ্ঞাত হামলাকারী তার গাড়িতে ঢিল ছোড়ে। মাহমুদুর রহমান গাড়ি ঘুরিয়ে তাদের ফলো করেন। তারা পালিয়ে যায়। দুই. তেজগাওয়ে সাত রাস্তার মোড়ে সনধ্যাবেলায় তার চলমান গাড়ির ওপর ভারী হাতুড়ি ছোড়া হয়। অজ্ঞাত হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। এরপর লন্ডনে একটি জনসমাবেশে জনৈক হামলাকারী ছুরি হাতে তাকে আক্রমণ করে এবং মাহমুদুর রহমানের স্যুট ছিড়ে যায়।

সরকারি হামলা ও মামলার মধ্যে রয়েছে ঢাকা এয়াপোর্টে দুইবার মাহমুদুর রহমানকে বিদেশ যেতে বাধা দেয়া হয়। এরপর আদালতের নির্দেশ পেয়ে তিনি বিদেশে যেতে পারেন। কিন্তু বিদেশে তার ব্যবসায়িক এপয়েন্টমেন্টগুলো তিনি মিস করেন এবং এর ফলে তার ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়। সর্বোপরি, উল্লেখিত সর্বশেষ দুটি মামলাসহ মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে সরকার মোট ৩১টি মামলা দায়ের করেছে।
সুতরাং এখন প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এবং আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যতই আইনের কথা বলুন না কেন, পাবলিক পারসেপশন (হপড়ধপহয়মসষ) হয়েছে মাহমুদুর রহমানকে ব্যক্তিগতভাবে দমনপীড়ন এবং আমার দেশ পত্রিকা বনধ করার লক্ষ্যে সরকার সর্বশেষ মামলা দুটি দায়ের করেছে বা করিয়েছে।

তাই যারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় এবং লেখকের অধিকারে বিশ্বাস করেন এবং যার মধ্যে নিশ্চয়ই আমেরিকান রাষ্ট্রদূতও আছেন, তাদের সবার আশু কর্তব্য হবে মাহমুদুর রহমানকে যেন রিমান্ডে না নেয়া হয় অন্তত সে বিষয়টি নিশ্চিত করা।

ফাস্ট না স্লো পয়জনিং?
গত বছরের মে মাসে লন্ডনে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তিনি ক্রাচে ভর দিয়ে হাটতেন এবং ডান হাতের আঙ্গুলের এক্সারসাইজ করতেন। যদিও তিনি বলতে চাননি ওয়ান-ইলেভেনের পর আটক অবস্থায় তার ওপর কি টর্চার হয়েছিল তবুও আমি বিভিন্নভাবে জানতে পেরেছিলাম ঘটনার কিছু অংশ। আমি শুধু বলতে চাই কোনো মানুষকেই, তা তিনি যে দল বা মতেরই হোন না কেন, আটক অবস্থায় তারেক রহমানের মতো নির্যাতনের শিকার যেন না হতে হয়। একইভাবে আমি বলতে চাই, কোনো মানুষকেই যেন শেখ হাসিনার মতো সাবজেলে আটক অবস্থায় স্লো পয়জনিংয়ের শিকার যেন না হতে হয়।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন সাবজেলে আটক অবস্থায় তাকে স্লো পয়জনিংয়ের চেষ্টা করা হয়েছিল। তার এ কথার সমর্থন আওয়ামী লীগের কিছু নেতা ও আওয়ামী লীগ সমর্থক ডাক্তারও করেছেন। শেখ হাসিনা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দী ছিলেন। তাই তাকে হয়তো ফাস্ট পয়জনিং নয়- স্লো পয়জনিংয়ের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু মাহমুদুর রহমান, যার জীবননাশের চেষ্টা ইতিমধ্যে করা হয়েছে, তিনি যদি নির্দিষ্ট ও সীমিত সময়ের জন্য রিমান্ডে থাকেন তাহলে অতি উৎসাহী সরকারি কর্মকর্তারা স্লো নয়, ফাস্ট পয়জনিংয়ের দিকে আগ্রহী হতে পারেন। আমি আশা করবো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কড়া নজর রাখবেন এবং মাহমুদুর রহমানের শারীরিক নিরাপত্তা একশ শতাংশ নিশ্চিত করবেন।

সরকারের আক্রোশের কারণ
মাহমুদুর রহমান এবং আমার দেশ-এর বিরুদ্ধে সরকারের আক্রোশের প্রধান পাচটি কারণ হলো-

এক. দৈনিক পত্রিকাটি তথ্যনির্ভর সমালোচনা করেছে এবং দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির গভীর অবনতির বিষয়ে নিয়মিত রিপোর্ট ছেপেছে। দুই. দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে স্ট্যাটিসটিক্স নির্ভর রিপোর্ট ছেপেছে। তিন. শেখ হাসিনার আমেরিকা প্রবাসী ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে আমেরিকান তেল কম্পানি শেভরনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং সেখানে বড় দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে রিপোর্ট ছেপেছে। চার. শেখ হাসিনার বেয়াই ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের পৈতৃক পরিবারের সঙ্গে রাজাকারদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে রিপোর্ট এবং ফটো ছেপেছে। পাচ. আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলামের পৈত্রিক পরিবারের সঙ্গে হেকিমি তথা ইসলামী ব্যবসায়ের সম্পৃক্তার রিপোর্ট ছেপেছে। গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো এসব রিপোর্টের ওপরে ছিল মাহমুদুর রহমানের লেখা নিজস্ব রাজনৈতিক কলাম।

ফলপ্রসূ কলাম
মাহমুদুর রহমানের লেখা যে ফলপ্রসূ হতে পারে সেটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বোঝেন। ওয়ান-ইলেভেনের পরে যে অতি অল্প কয়েকজন লেখক নিয়মিতভাবে সেনা শাসনের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রের পক্ষে এবং মাইনাস টু থিওরির বিরুদ্ধে অর্থাৎ শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মুক্তির পক্ষে লিখেছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন মাহমুদুর রহমান। অকাট্য যুক্তি এবং কোরান শরিফের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি লিখেছিলেন সপ্তাহের পর সপ্তাহ। আজ যে শেখ হাসিনা একজন মুক্ত মানুষ তার পেছনে মাহমুদুর রহমানের অবদান আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই একজন অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি রূপে প্রতিভাত হতে চাইবেন না। বরং তিনি তার ঋণ পরিশোধ করতে চাইলে মাহমুদুর রহমানের মুক্তির ও আমার দেশ-এর পুনঃপ্রকাশের নির্দেশ দিতে পারেন।

ভিন্ন সময়
কিন্তু সেই রকম নির্দেশ যদি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে না আসে তাহলে কি হতে পারে? কেউ কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগ আবার ৭৪-৭৫-এর বাকশালি সময়ে ফিরে যেতে চাইছে। সুতরাং মাহমুদুর রহমান মুক্তি পাবেন না এবং আমার দেশ পুনঃপ্রকাশিত হবে না।

এক্ষেত্রে বর্তমান সরকার যদি বিবেচনা করেন সময়টা বদলে গিয়েছে তাহলে সবারই মঙ্গল হবে।

১৯৭৪-৭৫-এ বাংলাদেশের মিডিয়ার বয়স ছিল খুবই কম। সেই সময়ে জনসাধারণ পাচটি দৈনিক পত্রিকা পড়তো- ইত্তেফাক, সংবাদ, বাংলাদেশ অবজার্ভার, দৈনিক বাংলা ও বাংলাদেশ টাইমস। শেষোক্ত দুটি পত্রিকা ছিল সরকারি মালিকানাধীন। ১৬ জুন ১৯৭৫-এ ইত্তেফাক ও বাংলাদেশ অবজার্ভারকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে এনে দৈনিক সংবাদসহ দেশের বাদবাকি সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু তখন দৈনিক পত্রিকার সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল কম। এখন টেলিকমিউনিকেশন্সে মালটি-ন্যাশনাল কম্পানি থেকে শুরু করে দেশীয় খাদ্য ও পানীয় এবং প্লাস্টিক সামগ্রী প্রস্তুতকারকরা তাদের পণ্য প্রসারের এবং ল্যান্ড ডেভেলপাররা ফ্ল্যাট বিক্রির জন্য নির্ভর করেন দৈনিক পত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ওপর। দ্বিতীয়ত, তখন মিডিয়াতে কর্মী সংখ্যা ছিল কম। এখন অনেক বেশি। আমার দেশ পত্রিকার সাবেক ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আতাউস সামাদ ইতিমধ্যে এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বলেছেন, পত্রিকাটি নিষিদ্ধ করার ফলে তিন শতাধিক কর্মচারী বেকার হয়ে যাবে। তৃতীয়ত, তখন পত্রিকার স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ব নজরদারি প্রায় ছিল না বললেই চলে। এখন স্যাটেলাইট সংযোগের ফলে এবং বিশ্ব জুড়ে সিপিজে, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স, এএইচআরসি জাতীয় বিভিন্ন সংস্থার সদা তৎপরতার ফলে সম্পাদক নির্যাতন ও পত্রিকার স্বাধীনতা হরণ তাৎক্ষণিকভাবে জানাজানি হয়ে যায়। বিশ্ব জনমত সরকারের বিরুদ্ধে চলে যায়। সেটাই হয়েছে গত কয়েক দিনে। আওয়ামী লীগ সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা এবার দ্রুত নষ্ট হয়েছে এই কারণে যে, ক্ষমতাসীন হবার পর চ্যানেল ওয়ান টিভি এবং ফেইসবুক বনধ করে দেয়া হয়েছে।

কিছু আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে থাকেন যে, গত জোট সরকারের আমলে অন্যায়ভাবে ইটিভিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এ কথা সম্পূর্ণ সত্য নয়। ইটিভির বিরুদ্ধে জোট সরকার কোনো মামলা করেনি। আওয়ামী লীগ সরকারেরই আমলে মামলাটি করেছিলেন পাবলিক ইন্টারেস্টে বা জনস্বার্থে কিছু ব্যক্তি। তাদের যুক্তি ছিল আওয়ামী লীগ সরকার ইটিভিকে টেরেস্টৃয়াল সম্প্রচারের সুবিধা দিয়েছে অবৈধভাবে। আদালতের রায় এই যুক্তি মেনে নিয়েছিল। ইটিভি যদি টেরেস্টৃয়াল সম্প্রচারের একক সুবিধা ভোগ করতো তাহলে শুধু বিটিভি-ই নয়, এখনকার সব স্যাটেলাইট নির্ভর প্রাইভেট চ্যানেল খুবই অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতো। সুতরাং ইটিভি নিষিদ্ধকরণ প্রসঙ্গটি অবান্তর। ইটিভি এখন অন্য সব প্রাইভেট চ্যানেলের মতোই শুধু স্যাটেলাইটে সম্প্রচার করছে এবং বিটিভি তার দ্বিতীয় টেরেস্টৃয়াল চ্যানেলে বিটিভি ওয়ার্ল্ড নামে অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ দূরীভূত হয়েছিল জোট সরকারের আমলে আদালত ঘোষিত রায়ে।

লেখা বনাম লেখা
সাপ্তাহিক যায়যায়দিন যখন ১৯৮৫ ও ১৯৮৬-তে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল এবং আমাকে প্রায় ছয় বছর নির্বাসিত থাকতে হয়েছিল তখন আমি একটি বিষয় বুঝতে পারতাম না। তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহমমদ এরশাদ, যিনি নিজেকে একজন কবি ও লেখক রূপে দাবি করতেন, কেন তিনি আমার লেখার উত্তর তার লেখাতে দিচ্ছেন না। তার শাসন আমলে অন্ততপক্ষে বারো জন সম্পাদক তার কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়েছিলেন। তাদের কেউ মন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন। অন্ততপক্ষে সেইসব অনুগত সম্পাদকদের কেউ অথবা অনুগৃহীত লেখক ও সাংবাদিকদের মধ্যে কেউ, আমার লেখার উত্তর লেখায় দিতে পারতেন। সেটা না করে আমার পত্রিকা বনধ করে দিয়ে আমাকে কেন নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল সেই প্রশ্নের উত্তর আমি পাইনি।

আজ প্রায় পচিশ বছর পরে সেই একই পথে আওয়ামী লীগ সরকার এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ, পচিশ বছর আগের তুলনায় এখন সরকার অনুগৃহীত ও উপকৃত সম্পাদক, লেখক, দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার সংখ্যা অনেক অনেক বেশি এবং তার ওপরে চলছে সরকার সমর্থক বিভিন্ন টিভি চ্যানেল।
এদের মধ্যে কেউই পারলেন না বা পারছেন না মাহমুদুর রহমানের লেখার উত্তর লেখায় দিতে? তার কথার উত্তর কথায় দিতে?
আশ্চর্য!

খরচের খাতায় ও টার্নিং পয়েন্ট
আমেরিকার বাকপটু টিভি একজিকিউটিভ রিচার্ড বি সালান্ট এস্কোয়ার ম্যাগাজিনে দেয়া ইন্টারভিউতে বলেছিলেন,
Government plans and programmes, even government leaders are expendable. A free press and the truth can never be.
অর্থাৎ, সরকারি প্ল্যান ও কর্মসূচিগুলোকে, এমনকি সরকারের নেতাদের, খরচের খাতায় রাখা যেতে পারে। কিন্তু একটি স্বাধীন সংবাদ মিডিয়া এবং সত্যকে কখনোই খরচের খাতায় রাখা সম্ভব নয়।

রিচার্ড সালান্টের এই উক্তি বারবার সত্য প্রমাণিত হয়েছে বাংলাদেশে। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এ বাকশাল সরকারের পতনের পর দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ, বাংলাদেশ অবজার্ভার প্রভৃতি তাদের স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছিল। ১৯৯০-এ এরশাদ সরকারের পতনের পর যায়যায়দিন পুনঃপ্রকাশিত হতে পেরেছিল।

বলা বাহুল্য, দৈনিক আমার দেশও পুনঃপ্রকাশিত হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের আগে না পরে? ভবিষ্যতেই এর উত্তর পাওয়া যাবে।
তবে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে, ১ জুন ২০১০-এ আমার দেশ-এর ডিক্লারেশন বাতিল হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি পত্রিকার জীবনে একটি টার্নিং পয়েন্টরূপে কাজ করবে। পুনঃপ্রকাশের পরে পত্রিকাটির সার্কুলেশন অনেক বেড়ে যাবে। বিশেষত তখন যদি মাহমুদুর রহমানের ছবি এবং আত্মপ্রচার কম থাকে বা একেবারেই না থাকে। আর সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের জীবনেও টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে তার বন্দিত্ব। বিএনপি নেতাদের অনুরোধে না হলেও, বিএনপি কর্মীদের দাবিতে মাহমুদুর রহমানকে সরাসরি বিএনপি রাজনীতিতে সমমুখ সারিতে যোগ দিতে হতে পারে।
আওয়ামী লীগের জন্য সেটা হবে চরম দুঃসংবাদ। কারণ সুশিক্ষিত ও সুবক্তা, যুক্তি এবং ভক্তি উভয়বাদী, সৎ ও কর্মঠ, সাহসী ও সত্যবাদী মাহমুদুর রহমান তখন আংশিকভাবে হলেও দূর করবেন বিএনপি নেতৃত্বের দুর্বলতা।


৫ জুন, ২০১০ দৈনিক নয়াদিগন্তে প্রকাশিত।

রবিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১০

ক্রুসেডের লক্ষ্য এখন বাংলাদেশ

ক্রুসেডের লক্ষ্য এখন বাংলাদেশ


এগার শতকের শেষ দশক থেকে পরবর্তী প্রায় দু’শ’ বছর ধরে ইউরোপীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে লাগাতার যুদ্ধ চালিয়ে গেছে তাকেই ক্রুসেড নামে অভিহিত করা হয়েছে। ১০৯৫ সালে পোপ উরব্ান-২ (Pope Urban II) বাইজেনটাইন সম্রাট এলেক্সিয়াস-১ (Emperor Alexius I)-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইউরোপের প্রধানত লাতিন খ্রিস্টানদের সমন্বয়ে সেনাবাহিনী গঠন করে প্রথম তুর্কি সেলজুকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে অবতীর্ণ হন এবং শেষ পর্যন্ত ১০৯৯ সালে তখন পর্যন্ত মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণাধীন পবিত্র জেরুজালেম নগরী অধিকার করতে সক্ষম হন। প্রকৃতপক্ষে মুসলমানের অর্ধচন্দ্রের (Crescent) বিরুদ্ধে খ্রিস্টীয় ক্রসের (Cross) যে আগ্রাসন তাকেই লাতিন ইউরোপ ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ নাম দিয়ে মধ্যযুগে ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এসব তথাকথিত ধর্মযুদ্ধ তত্কালীন সময়ে খ্রিস্টান ধর্মগুরু পোপের অনুমোদন ও নির্দেশক্রমেই পরিচালনা করা হতো। প্রথম ক্রুসেডে মুসলমানরা জেরুজালেম থেকে বিতাড়িত হলেও ১১৮৭ সালের তৃতীয় ক্রুসেডে সুলতান সালাদিনের নেতৃত্বে মুসলমান বাহিনী জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করে। ক্রুসেডের হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস বর্তমান দশকে নতুন করে প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে। নবরূপে ক্রুসেডের ধারণার সূত্রপাত অবশ্য ১৯৯৩ সালে স্যামুয়েল পি হান্টিংটন তার সভ্যতার সংঘাত (Clash of Civilizations) তত্ত্বের মাধ্যমেই করে গেছেন। গত এক দশক ধরে আফগানিস্তান ও ইরাকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী যৌথবাহিনীর যে আগ্রাসন চলছে সেটি মূলত মধ্যযুগীয় ক্রুসেডেরই আধুনিক সংস্করণ মাত্র। ২০০১ সালে মার্কিনিদের যুদ্ধ প্রস্তুতিকালীন সময়ে তত্কালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ক্রুসেড শব্দটি একবার উচ্চারণও করেছিলেন। আন্তর্জাতিক মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির আশঙ্কা থেকে তার উপদেষ্টারা আর দ্বিতীয়বার তাকে ওই শব্দটি উচ্চারণ করতে না দিলেও স্বঘোষিত Born again Christian জর্জ বুশ (জুনিয়র) যে বর্তমান বিশ্বকে ক্রুসেডের আলোকেই দেখে থাকেন এটা তার সামগ্রিক বক্তব্য, আচার-আচরণে পরিষ্কার। স্ক্যানডিনেভিয়াভুক্ত রাষ্ট্রসমূহসহ আধুনিক ইউরোপের অনেক দেশেই ইসলাম বিরোধিতা ক্রমেই প্রকট রূপ ধারণ করছে। ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড ইত্যাদি রাষ্ট্রের ইসলামবিদ্বেষীরা রীতিমত উন্মাদের মতো আচরণ করছে। ক্যাথলিকদের ধর্মগুরু বর্তমান পোপ বেনেডিক্ট-১৬ তার প্রকাশ্য ইসলামবিরোধী বক্তব্যের জন্য কিছুদিন আগেও যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছেন। বিশ্ব রাজনীতির উপরোক্ত বাস্তবতার আলোকে এবার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃশ্যপট বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
আমার অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র মুসলমান প্রধান রাষ্ট্র যেখানে সরকারি মদতে গণমাধ্যমে অবিরত ইসলামবিরোধী কুিসত প্রচার চালানো হয়। আমাদের জাতীয় দিবসগুলোতেও ঐক্যের বাণী প্রচারের পরিবর্তে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো হয়ে থাকে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এই দুষ্কর্মটি যারা করে থাকেন তাদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আবার মুসলমান পরিবার থেকেই এসেছেন এবং পিতৃ প্রদত্ত মুসলমান নাম ধারণ করেই আছেন। পিতা-মাতার ধর্মবিশ্বাসের প্রতি এই অপরিসীম বিরাগ সৃষ্টির পেছনে ঠিক কোন দর্শন কাজ করেছে তা আমার জানা নেই। তবে বাংলাদেশকে যে একটি শ্রেণী মুসলমানপ্রধান, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আর দেখতে চায় না, সেটি ক্রমেই প্রমাণিত হচ্ছে। তারা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একাধারে বীরত্বপূর্ণ ও ট্র্যাজিক ঘটনাবলীকে দীর্ঘদিন ধরে সাফল্যের সঙ্গে তাদের উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে চলেছে। পশ্চিম পাকিস্তানের পুঁজিপতি, সামন্তবাদী গোষ্ঠী ও সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামকে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ গণমাধ্যমে ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে দেখানোর অপচেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চললেও দৃশ্যত প্রচারণার তীব্রতা বেড়েছে নব্বইয়ের দশক থেকে। স্যামুয়েল হান্টিংটনের চরম ইসলামবিদ্বেষী সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বের উদ্ভবও যে প্রায় একই সময়ে হয়েছে এই বিষয়টিকে কেবল কাকতালীয় ভেবে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। আগেই বলেছি হাজার বছর আগে ইসলামিক ক্রিসেন্টকে মোকাবেলা করার জন্যই খ্রিস্টান ধর্মযাজকরা ক্রুসেড আবিষ্কার করেছিলেন। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে নির্যাতনকারী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্বল্পসংখ্যক এ দেশীয় দালালগোষ্ঠী মুসলমান ধর্মাবলম্বী হওয়ার বিষয়টিকে সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বর্তমান দোসররা সুযোগ হিসেবে নিয়ে ইসলামের সব প্রতীককে জনগণের কাছে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে চলেছে।
ইসলামের আদিযুগ থেকেই চাঁদ-তারা ইসলামী আন্দোলনের প্রতীক রূপে এই ধর্মাবলম্বীদের পতাকায় প্রদর্শিত হয়ে আসছে। এই প্রতীক কিংবা সবুজ রং পাকিস্তানের পতাকায় আছে বলেই এগুলো সে দেশটির সম্পত্তি হয়ে যায়নি। প্রসঙ্গক্রমে, সমাজতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে অনেক দেশেই যে কাস্তে-হাতুড়ি ব্যবহারের রেওয়াজ রয়েছে সেটিও পাঠক জানেন। মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় রং ছিল সবুজ এবং অনেক হাদিসে সবুজকে বেহেস্তিদের পোশাকের রং হিসেবে বর্ণনা করা আছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো পবিত্র কোরআন শরীফের সূরা আদ দাহার-এর ২১ নম্বর আয়াতে স্বয়ং আল্লাহ্তায়ালা জান্নাতবাসীদের পোশাকের যে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন তা নিম্নরূপ :
‘তাদের আবরণ হবে চিকন সবুজ রেশম ও মোটা সবুজ রেশম।’
দাড়ি রাখা ইসলাম ধর্ম পালনে অপরিহার্য না হলেও আমাদের প্রিয় নবী যেহেতু দাড়ি রাখতেন, কাজেই এটি আমরা সুন্নত হিসেবেই পালন করে থাকি। নামাজ আদায় করার সময় টুপি পরে মাথা ঢেকে রাখাও আমাদের ধর্ম পালনেরই রীতি। মস্তক আবৃত করার এই রীতি অন্যান্য সেমেটিক ধর্মেও রয়েছে। ইহুদি জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এক বিশেষ ধরনের টুপি (Skull Cap) পরাকে তাদের ধর্ম পালনের অত্যাবশ্যকীয় আচার বলেই মনে করে। খ্রিস্টান ধর্মযাজকরা যথেষ্ট জাঁকজমকপূর্ণ টুপি পরেই রোববার চার্চে ধর্মোপদেশ প্রদান করে থাকেন। অথচ, বাংলাদেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমে আজ যুদ্ধাপরাধীর কল্পিত চেহারা দেখাতে গিয়ে মুখে দাড়ি এবং মাথায় সবুজ রংয়ের চাঁদ-তারাখচিত টুপি পরিহিত এক রক্তলোলুপ, বীভত্স দানবকে তরুণ প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করছে। পশ্চিমা মিডিয়াতেও সবুজ রংকে সচরাচর নেতিবাচকভাবেই প্রদর্শন করা হয়ে থাকে। হলিউডের অধিকাংশ ছবিতে শয়তানকে (Devil) সবুজ দেহাবরণবিশিষ্ট দেখানো হয়। এ দেশেও রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী দেখানোর নামে ইলেক্ট্রনিক এবং প্রিন্ট উভয় মিডিয়াতেই ইসলামের চিহ্নসমূহকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের মতো করেই নেতিবাচকভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছে। এদিকে আবার সরকারের সব মহল থেকেও টুপি, দাড়ি এবং হেজাবকে জঙ্গিবাদের চিহ্ন হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কট্টর সাম্রাজ্যবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী জর্জ বুশের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের একজন স্বঘোষিত সাথী। মন্ত্রিসভায় তার সহকর্মী, আইনমন্ত্রী বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসাগুলোকে জঙ্গিবাদের প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ইসলামী ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ইসলাম ধর্মকে জঙ্গিবাদের জন্য দায়ী করে বক্তব্য দেয়ার পরও স্বপদে বহাল রয়েছেন। সরকার এবং তাদের সমর্থকদের কার্যকলাপে মনে হতে পারে অন্তত এদেশে ইসলামকে পরাজিত করতে এক হাজার বছর আগের মতো ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের আর কষ্ট করার দরকার নেই, বাংলাদেশে ক্রুসেড পরিচালনার দায়িত্ব এদেশের মুসলমান নামের লেবাসে ইসলামবিরোধীরাই গ্রহণ করেছে। সরকার এবং তাদের সমর্থক গণমাধ্যমের অবস্থান হলো, জামায়াতে ইসলামী এ দেশে রাজনীতি করতে পারবে না, কারণ তারা যুদ্ধাপরাধী; হিযবুত তাহরিরকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে কারণ তারা সরকারের বিবেচনায় জঙ্গি; দেশ থেকে কওমী মাদ্রাসা উঠিয়ে দিতে হবে, কারণ আইনমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী সেখানে জঙ্গি প্রজনন কারখানা রয়েছে। সোজা কথা, ইসলাম ধর্মের আদর্শভিত্তিক কোনো রাজনীতি বাংলাদেশে করতে দেয়া হবে না। এ সবই বিদেশি প্রভুদের নির্দেশে ও তাদের সন্তুষ্টির জন্যই করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় বিএনপির নীতিনির্ধারকরা যদি আশা করে থাকেন যে, পশ্চিমারা বর্তমান সরকারের মতো অনুগত মিত্র ত্যাগ করে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে সমর্থন করবে তাহলে তারা এখনও বোকার স্বর্গে বাস করছেন। জামায়াতে ইসলামীও দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন তোষণ নীতি অনুসরণ করার ফল এখন ভালোভাবেই ভোগ করছে। বাংলাদেশের জনগণের উপলব্ধি করা প্রয়োজন, সপরিবারে শেখ মুজিব হত্যার জন্য আওয়ামী লীগ এক সময় সিআইএ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি দায়ী করলেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে শেখ হাসিনার কোনো সমস্যা হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও একদা সোভিয়েতপন্থী আওয়ামী লীগকে বুকে টেনে নিয়েছে একবিংশ শতাব্দীর ক্রুসেডের সাথী হিসেবে।
ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইল-ইউরোপীয় ইউনিয়ন সমন্বয়ে গঠিত সাম্রাজ্যবাদী অক্ষশক্তি শত শত বিলিয়ন ডলার খরচ করে এবং নিজ দেশের হাজার হাজার নাগরিকের প্রাণহানি ও অঙ্গহানির বিনিময়ে ইরাক ও আফগানিস্তানে বুশ কথিত আধুনিক যুগের ক্রুসেড প্রায় এক দশক ধরে অব্যাহত রেখেছে। একবিংশ শতকের ক্রুসেডে ইরাক ও আফগানিস্তান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দেশ দুটির লাখ লাখ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছে; মানব সভ্যতার আদি নিদর্শন লুটপাট করে বিজয়ীদের দেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে; উভয় দেশকে চিরস্থায়ী দাসত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ করার প্রক্রিয়া চলছে। সাম্রাজ্যবাদী অভিন্ন গোষ্ঠী আজ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ইসলামিক রাষ্ট্র বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করেছে। এক নতুন ধরনের পরীক্ষা চালানো হচ্ছে আমাদের পবিত্র মাতৃভূমি নিয়ে। সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় জেনারেল মইন সেনাবাহিনীকে জাতিসংঘ শান্তি মিশন থেকে চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে শিখণ্ডি রূপে দণ্ডায়মান রেখে তিন বছর আগে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন। ২০০৭ সালে ক্ষমতা দখলের পর মইন-ফখরুদ্দীন জুটি তাদের বিদেশি প্রভুদের নির্দেশনা অনুযায়ী জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামী শক্তিকে নির্মূল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেয়ার তার এই হীন প্রচেষ্টায় পেছন থেকে পাশ্চাত্যের সঙ্গে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী ভারতও জেনারেল মইনকে সেই সময় প্রয়োজনীয় সমর্থন প্রদান করেছে। এক-এগারো পরবর্তী সময়ে বহুবার লিখেছি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ইসলাম বিদ্বেষী একটি সেক্যুলার গোষ্ঠীকে অধিষ্ঠিত করার যে পরিকল্পনা ২০০২ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে প্রণয়ন করা হয়েছিল তারই একটি পর্যায় ছিল মইন-মাসুদ গংয়ের ক্ষমতা দখল। আনোয়ার চৌধুরী, বিউটেনিস, রেনাটা, ফ্রয়েন মিলিতভাবে যে কৌশল প্রয়োগ করে বাংলাদেশে চাঁদ-তারাকে পরাজিত করে বিনা খরচায় ক্রুসেডের ঝাণ্ডাকে বিজয়ী করতে পেরেছে সেখান থেকে অন্যান্য মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রসমূহেরও শিক্ষা নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশে ইউএনডিপি’র সাবেক প্রধান এদেশ থেকে বিদায়ের পূর্বমুহূর্তে ষড়যন্ত্রের সব দায়-দায়িত্ব অবশ্য জেনারেল মইন এবং সেই সময়কার অন্যান্য সিনিয়র জেনারেলদের ঘাড়ে চাপিয়ে গেছেন। এটাই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের চিরকালের কৌশল। এক সময়ের মার্কিন মিত্র, সেক্যুলার ভাবাদর্শের সাদ্দাম হোসেনকে সপরিবারে হত্যা করতে বর্তমান বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তির নীতিনির্ধারকরা কোনো রকম বিবেকের তাড়না অনুভব করেনি। রেনাটাও বাংলাদেশের দেশদ্রোহী জেনারেলকে ভাগ্যের হাতে সমর্পণ করে চীনদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এক-এগারোর বিদেশি কুশিলবদের মধ্যে এখনও যিনি সর্বশেষ ব্যক্তি হিসেবে বাংলাদেশে রয়ে গেছেন সেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ফ্রয়েন তার যাওয়ার মুহূর্তে বাংলাদেশের বিমূঢ় জনগণকে সর্বশেষ কী তথ্য দিয়ে যান সেটি জানার জন্য আমরা উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছি।
বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের প্রচার চালিয়ে এদেশের জনগণের একটি বড় অংশের ধর্মবিশ্বাস দুর্বল করে দিয়েই সাম্রাজ্যবাদীরা রক্তপাতহীন ক্রুসেডে জয়লাভ করেছে। এখন সেই জয়কে সংহতকরণের পালা চলছে। বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের নমুনা প্রতিদিনই দেখতে পাচ্ছি। যে বিভ্রান্ত সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মার্কিন ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ তাদের উগ্র সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য পূরণে সফল হয়েছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সর্বপ্রথম সেই সেনাবাহিনীকেই চরম আঘাত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে নির্বাচন পূর্বকালে প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের লিখিত একটি নিবন্ধের উল্লেখ করা যেতে পারে, যেখানে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি মৌলবাদী প্রতিষ্ঠান রূপে চিত্রিত করেছিলেন। সেই লেখায় তিনি সেনাবাহিনীতে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনারও আগাম ইঙ্গিত প্রদান করেছিলেন। সজীব ওয়াজেদ জয় কোন দেশের নাগরিক তা জাতির কাছে এখনও পরিষ্কার নয়। তার স্ত্রী মার্কিন নাগরিক এ তথ্য আমরা জানি। কিন্তু, তিনি খ্রিস্টান না ইহুদি ধর্মাবলম্বী তা নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে। কাজেই তথাকথিত বিডিআর বিদ্রোহের নামে ২০০৯-এর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার পিলখানায় নির্বিচার সেনা অফিসার হত্যাকাণ্ডকে শুধু কাকতালীয় বিবেচনার কোনো সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।
বিডিআর হত্যাকাণ্ড- পরবর্তী চৌদ্দ মাসে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি ইতিহাসের ঘৃণ্যতম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কলঙ্কিত হয়েছে। বিরোধী দল এবং মতকে দমন করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র তার সব নির্মমতা ও ভয়াবহতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটে চলছে, নারীর সম্ভ্রম ভূলুণ্ঠিত হয়েছে, রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের মাত্রা এক-এগারোর সরকারকে অতিক্রম করেছে, ইসলাম ধর্ম বিশ্বাসীদের ওপর নিপীড়ন রোমান যুগে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের করুণ অবস্থা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, বিচারের বাণী আর নিভৃতে নয় প্রকাশ্যেই কেঁদে চলেছে। যে বিদেশি কূটনীতিকরা উপদেশ-নির্দেশ দিয়ে চার দলীয় জোট সরকারকে পাঁচ বছর একেবারে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল, তারাই হঠাত্ করে ভিয়েনা কনভেনশনের প্রতি পরম শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সূত্রে শুনতে পাই, দূতাবাসের বিভিন্ন গোপনীয় বৈঠকে এরা নাকি বর্তমান সরকারের ইসলামবিরোধী সার্বিক কর্মকাণ্ডে যারপরনাই সন্তুষ্টি প্রকাশ করে থাকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত চিহ্নিত চরম দক্ষিণপন্থী, ইসলামবিদ্বেষী দেশগুলোর কূটনীতিকরা বর্তমান সরকারকে পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী করানোর কলাকৌশল প্রণয়ন নিয়ে আগাম আলাপ-আলোচনা আরম্ভ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সংসদ, সচিবালয়, আদালত, সেনাবাহিনী, নির্বাচন কমিশন, দুদক ইত্যাদির ভূমিকা এখন সুতোয় টানা পুতুলের চেয়ে বেশি কিছু নয়। এমতাবস্থায়, রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে হলে সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি প্রকৃত দেশপ্রেমিক, বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত, ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী, গণতান্ত্রিক মোর্চাকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসানোর বিকল্প নেই।

[অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত মাহমুদুর রহমানের মন্তব্য প্রতিবেদনটি হুবহু তুলে দেয়া হয়েছে।]